মাহমুদ মীর
‘নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬’-এ বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) রূপান্তরমূলক সম্ভাবনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকস (BRICS) নেতারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সর্বজনীনতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এআই-সম্পর্কিত সম্পদের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তাঁরা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক শাসন’ (Global Governance of Artificial Intelligence) বিষয়ক জোটের বিবৃতি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন এবং এআই-জনিত সম্ভাব্য ঝুঁকি হ্রাসের গুরুত্ব স্বীকার করেন।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত এই ঘোষণাপত্রে একটি বিস্তৃত প্রযুক্তিগত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI), টেলিযোগাযোগ, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, স্টার্টআপ এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা।
এতে ডিজিটাল ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ—যেমন সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, তথ্য সুরক্ষা সমস্যা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার—মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারে এই ঘোষণাপত্রে নির্ভরযোগ্য এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং এআই সিস্টেমের জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় রেখে এআই সম্পদের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব এতে তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ডিজিটাল ও আইসিটি (ICT) ইকোসিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করে, এই ঘোষণাপত্রে একটি “সার্বভৌম ও স্বনির্ভর ডিজিটাল ইকোসিস্টেম” গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তর প্রক্রিয়াকে সহজতর করার লক্ষ্যে ব্রিকস দেশগুলোর জন্য একটি ‘ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিপোজিটরি’ বা ডিজিটাল অবকাঠামো ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এতে রাখা হয়েছে।
তাছাড়া, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সংযোগ ও নেটওয়ার্কের সক্ষমতা (resilience) বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাবমেরিন ক্যাবল অবকাঠামো নিয়ে চলমান সহযোগিতাকে ব্রিকস দেশগুলো সমর্থন জানায়। উচ্চ-গতির যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ এগিয়ে নিতে তারা ‘ব্রিকস এসটিআই (STI) স্টিয়ারিং কমিটি’-র মাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানায়।
আইসিটি সরবরাহ-শৃঙ্খলের (supply-chain) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিন্ন প্রোটোকল ও মানদণ্ড নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে এই ঘোষণাপত্রে; পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা ও যৌথ গবেষণার গুরুত্বও এতে তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেধা সম্পদের (intellectual property) পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ডিজিটাল ক্ষেত্রে মেধা স্বত্ব বা অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করে, এই ঘোষণাপত্রে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোকে প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তরুণ গবেষক ও স্টার্টআপগুলোকে সম্পৃক্ত করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম শক্তিশালীকরণ এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগকেও এতে সমর্থন জানানো হয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’ (Industry 4.0) এবং উন্নত ডিজিটাল উৎপাদন প্রযুক্তি বিষয়ক সহযোগিতা।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬’ ব্রিকস (BRICS) দেশগুলোর জন্য একটি দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছে, যার লক্ষ্য হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ডিজিটাল প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগানো।



