ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
HomeUncategorizedজাহাজভাঙা শিল্পের শ্রেণি পরিবর্তন: অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বনাম পরিবেশ ও শ্রমিকের সুরক্ষা

জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রেণি পরিবর্তন: অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বনাম পরিবেশ ও শ্রমিকের সুরক্ষা

বিশেষ প্রতিবেদক: জাহাজভাঙা শিল্পকে বিশ্বজুড়ে পরিবেশের জন্য অন্যতম সর্বোচ্চ দূষণকারী শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এই শিল্পকে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলীয় সৈকতগুলোতে জাহাজ ভাঙার কারণে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, মাটি ও বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এই উচ্চ ঝুঁকি বিবেচনা করে ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩’ অনুযায়ী জাহাজভাঙা কার্যক্রম ও ইয়ার্ডকে এতদিন ‘লাল’ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছিল।
সম্প্রতি সরকারের এক নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে এই শিল্পকে ‘লাল’ থেকে ‘কমলা’ শ্রেণিতে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দেশে পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।
কমিটি গঠন ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
চলতি বছরের আগস্ট মাসে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসংক্রান্ত আইন ও নীতিমালা পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে গঠিত এই কমিটিতে শিল্পমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং অর্থ ও আইন সচিবেরা সদস্য হিসেবে ছিলেন।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর এই কমিটি জাহাজভাঙা শিল্পকে লাল থেকে কমলা শ্রেণিতে নামিয়ে আনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াটি বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কারণ এত বড় একটি পরিবেশগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কমিটিতে কোনো পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি বা পরিবেশ বিশেষজ্ঞকে রাখা হয়নি।
মালিকপক্ষের দাবি ও সরকারি যৌক্তিকতা
জাহাজভাঙা শিল্পের উদ্যোক্তা ও মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এই শিথিলকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
  • আর্থিক ক্ষতি হ্রাস: উদ্যোক্তাদের মতে, লাল শ্রেণিতে থাকার কারণে একটি ইয়ার্ড স্থাপনের অনুমোদন পেতেই প্রায় ৯০ দিন বা তিন মাস সময় লেগে যেত, যা তাঁদের ব্যবসায়িক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল।
  • বিনিয়োগ সুরক্ষা: পরিবেশমন্ত্রীর তথ্যমতে, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০টি গ্রিন ইয়ার্ড রয়েছে, যেখানে একেকটি ইয়ার্ডে ব্যবসায়ীরা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তাই শিল্প ও পরিবেশ উভয়কে বাঁচাতেই এই সময়ক্ষেপণ কমানো প্রয়োজন।
  • ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খানের মতে, এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় শিল্প। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে ছয় হাজার জাহাজ ভাঙার উপযোগী হবে। গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ এই বিশাল বাজারের একটি বড় অংশ লুফে নিতে পারবে।
বিদ্যমান ‘লাল’ শ্রেণির প্রক্রিয়া বনাম ‘কমলা’ শ্রেণির পরিবর্তন
বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী লাল শ্রেণির শিল্পের জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করা বাধ্যতামূলক, যা ভারত ও পাকিস্তানের জাহাজভাঙা শিল্পের জন্যও প্রযোজ্য।
এই প্রক্রিয়ায় ইয়ার্ডের দূষণ রোধের বিস্তারিত কার্যপরিধি (টিওআর) পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে জমা দিতে হয়। এরপর অধিদপ্তরের প্রতিনিধির নেতৃত্বে স্থানীয় জনমত যাচাই করে জেলা কার্যালয় ও সদর দপ্তরের যৌথ যাচাই-বাছাই শেষে প্রথমে ‘অবস্থানগত ছাড়পত্র’ এবং পরে সরজমিন পরিদর্শন শেষে ‘পরিবেশগত ছাড়পত্র’ দেওয়া হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে ৯০ দিন সময় লাগত। এখন শিল্পটি ‘কমলা’ শ্রেণিতে চলে গেলে এই কঠোর বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না।
কমলা শ্রেণির জন্য উদ্যোক্তাদের কেবল পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ে প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। বিভাগীয় কার্যালয় চাইলে ইআইএ করার সুপারিশ করতে পারবে, তবে তা মানার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
এছাড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আর সদর দপ্তরে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না, বিভাগীয় কার্যালয়ই অনুমোদন দিয়ে দিতে পারবে।
পরিবেশ ও শ্রমিকদের ওপর ঝুঁকির আশঙ্কা
সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে পরিবেশ ও শ্রমিকের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে বলে পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

১. তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা: পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতেই, বিধিমালা শিথিলের কারণে একটি ইয়ার্ড ঠিক কী পরিমাণ দূষণ করবে বা পরিবেশে তার প্রভাব কেমন হবে, তা জানার সুযোগ থাকবে না এবং সার্বিক তদারকি ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

২. শ্রমিকদের জীবনহানি: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে বর্তমানে বছরে ১৫০ থেকে ২০০টি জাহাজ ভাঙা হয় এবং প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক এতে কাজ করেন। গত আগস্ট মাসেও গ্যাস নিঃসরণে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
পরিবেশ শিথিলকরণের ফলে এই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ শ্রমিকদের জীবনকে আরও বেশি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে।

৩. আইনি সাংঘর্ষিকতা: বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মতে, এই বিধিমালা শিথিল করার সিদ্ধান্তটি জাহাজভাঙা দূষণ রোধে চলমান মামলা এবং আদালতের রায় ও আদেশের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আদালতকে কিছুই জানানো হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও করণীয়
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, কেবল উন্মুক্ত সমুদ্র সৈকতে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে জাহাজভাঙা শিল্পকে কখনোই ‘সবুজ’ বা পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব নয়।
এর স্থায়ী সমাধানের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
  • ড্রাইডক স্থাপন: বাংলাদেশে নিরাপদ উপায়ে জাহাজ ভাঙতে হলে উন্মুক্ত সৈকতের পরিবর্তে ‘ড্রাইডক’ বা বিশেষায়িত আবদ্ধ স্থাপনা তৈরি করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
  • বাসেল কনভেনশনের প্রতিপালন: বাসেল কনভেনশনের মূল কথা হলো—যার বর্জ্য, তাকেই দায়িত্ব নিতে হবে。 উন্নত দেশের বর্জ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশে এলে সেই বর্জ্য নিষ্কাশনের দায়দায়িত্ব উন্নত বিশ্বকেই নিতে হবে।
  • আইনের কঠোর প্রয়োগ: এই শিল্পকে নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানের করতে হলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল পরিবেশ ও শ্রম আইনের কঠোর প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে জাহাজভাঙা শিল্পের গুরুত্ব অনস্বীকার্য, কিন্তু পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, তা পরিবেশের ধ্বংস ও শ্রমিকের জীবনের মূল্যে হতে পারে না।
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের মতো পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের বাদ দিয়ে একতরফাভাবে বিধিমালা শিথিলের সিদ্ধান্ত বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমল থেকে কাম্য নয়।
তাই টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে পরিবেশ ও শিল্প—উভয় রক্ষা করার কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক কৌশল গ্রহণ করাই হবে রাষ্ট্রের সঠিক পদক্ষেপ।
আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular