নিজস্ব প্রতিবেদক: একুশে বইমেলায় ভারতে নির্বাসিত বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ‘চুম্বন’ বই রাখা ও বিক্রির অভিযোগে ‘সব্যসাচী’ নামে একটি স্টলে কথিত তৌহিদি- জনতা নামের একদল ব্যক্তিরা হট্টগোল ও বাগবিতণ্ডায় জড়ায় প্রকাশক শতাব্দী ভব’র সাথে। তারা মব তৈরীরও চেষ্টা করেন। আইন হাতে তুলে নিয়ে ভবকে কানে ধরানোর চেষ্টা করে। একপর্যায়ে কর্তব্যরত পুলিশ তাকে মবজাস্টিজের হাত থেকে রক্ষাকরে হেফাযতে নিয়ে যায়।
সোমবার বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ১২৮ নম্বর স্টলে এ পরিস্থিতি তৈরি হলে সব্যসাচী নামের স্টলটি সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ দিকে বইমেলায় তসলিমা নাসরিনের বই রাখাকে কেন্দ্র করে বাগবিতণ্ডা ও হট্টগোলের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে রাতেই ইংরেজি ও বাংলায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, অপ্রীতিকর ঘটনা উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চাকে ক্ষুণ্ন করে। এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
বিবৃতিতে বলা হয়, একুশে বইমেলা এ দেশের লেখক ও পাঠকদের প্রাণের মেলা। এ দেশের সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, চিন্তক, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশা-বয়সের মানুষের মিলনস্থল। বইমেলায় এই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বাংলাদেশের উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চাকে ক্ষুণ্ন করে, ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের মর্যাদার প্রতি অবমাননা প্রদর্শন করে।
আরও বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ ও বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষকে এ ঘটনার তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছে। মেলায় নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং এই তাৎপর্যপূর্ণ স্থানে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া দেশে ‘মব ভায়োলেন্সের’ (দলবদ্ধ সহিংসতা) যেকোনো ঘটনা প্রতিরোধে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
এদিকে রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে দলের নেতাকর্মী-শিষ্যদের প্রতি কড়া বার্তা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।বইমেলায় সব্যসাচী প্রকাশনীর স্টলে ভাঙচুরের পরেই যেন তার ‘হুশ’ ফিরে পেল অনেক তাই বলছেন।
ফেসবুকে এক পোস্টে উপদেষ্টা মাহফুজ বলেন, ‘অভ্যুত্থানের পক্ষে হলে মব করা বন্ধ করেন, আর যদি মব করেন, তাইলে আপনাদেরও ডেভিল (শয়তান) হিসেবে ট্রিট (গণ্য) করা হবে।
আরও বলেছেন, আজকের ঘটনার পর আর কোনো অনুরোধ করা হবে না। আপনাদের কাজ না, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া।
মাহফুজ লিখেছেন, ‘কথিত আন্দোলন আর মবের মহড়া আমরা এখন থেকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করব। রাষ্ট্রকে অকার্যকর এবং ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা করা হলে একবিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না।’
কথিত তৌহিদী জনতার উদ্দেশ্যে মাহফুজ আলম আরও লিখেছেন, আপনারা দেড় দশক পরে শান্তিতে ধর্ম ও সংস্কৃতি পালনের সুযোগ পেয়েছেন। আপনাদের আহাম্মকি কিংবা উগ্রতা আপনাদের সে শান্তি বিনষ্টের কারণ হতে যাচ্ছে। জুলুম করা থেকে বিরত থাকেন, নইলে আপনাদের ওপর জুলুম অবধারিত হবে। লা তাযলিমুনা ওলা তুযলামুনা—জুলুম করবেন না, জুলুমের শিকারও হবেন না। এটাই আপনাদের কাছে শেষ অনুরোধ!’
এদিকে বইমেলায় প্রকাশকের ওপর ‘মব’ তৈরির অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদে মিছিল করেছেন বাম সংগঠনের শিক্ষার্থীরা। তারা মিছিল নিয়ে মেলা প্রদক্ষিণ করে সব্যসাচী স্টলের সামনে বক্তব্য দেন।
এসময় তারা বইমেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, বইমেলায় হামলা কেন, ইন্টেরিম জবাব দাও, মবতন্ত্রের আস্তানা, বাংলাদেশে হবে না,অভিজিৎ, দীপন, লাগবে আর কতজন’সহ একাধিক স্লোগান দেন।
এসময় বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল বলেন, অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আজ একটি নির্লজ্জ ঘটনা ঘটেছে। আমরা শুরু থেকে বলেছি, বইমেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ নাজুক। এ হামলার আগে একটা গোষ্ঠী গতকাল থেকে অনলাইনে হামলার পাঁয়তারা চালিয়েছে। কিন্তু প্রকাশনীর নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উপরন্তু তারা হামলা করে বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাইনি।
তিনি বলেন, আমরা এমন ইন্টেরিম সরকারকে ধিক্কার জানাই। অধ্যাপক আজম বাংলা একাডেমির পরিচালক হওয়ার পর আমরা আশা করেছিলাম, তার নেতৃত্বে বাংলা একাডেমি অনেক দূর এগিয়ে যাবে। কিন্তু তার নেতৃত্বে দেখতে পেলাম, নির্লজ্জ ঘটনা ঘটল। তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। এ হামলার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে মাজার, মন্দিরের মধ্য দিয়ে। হামলার সঙ্গে যারা জড়িত, সবাইকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
ঘটনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, কথিত তৌহিদি জনতা নামের একদল যুবক সব্যসাচী স্টলের সামনে গিয়ে প্রকাশক শতাব্দী ভবের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে দুপক্ষই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এসময় যুবকরা শতাব্দী ভবকে আওয়ামী লীগের দালাল কি না জিজ্ঞেস করেন। একদিকে তারা ‘আওয়ামী লীগের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’ স্লোগান দেন অন্যদিকে শতাব্দী ভব ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে থাকেন। ঐ সময় মবজাস্টিসের নামে আইন হাতে তুলে নিয়ে ভবকে কান ধরে মাফ চাইতে বলেন তারা। এসময় পুলিশ পাশেই দাঁড়িয়েছিল।পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ স্টলের সামনে থেকে শতাব্দীকে সরিয়ে নেয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়ার ছাত্র কাজী মাযহরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, গতকাল আমরা জানতে পেরেছি, সব্যসাচী নামের স্টলে তসলিমা নাসরিনের বই পাওয়া যায়। তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগ। প্রতিদিন ফেসবুকে ড. ইউনূস সরকারকে সন্ত্রাসী-জঙ্গি বলে আসছেন। এরপর আমরা ফেসবুকে এ বিষয়ে লিখেছি। পরে প্রশাসনের কথায় সে বই সরিয়ে ফেলা হয়।
তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, আমরা দেখলাম, তিনি (শতাব্দী ভব) আজ একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। যেখানে তিনি বলেন, ‘উগ্রবাদ এবং জঙ্গিবাদে’র চাপে পড়ে বইমেলা থেকে বই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই আমরা কয়েকজন আজ এসে তাকে এ প্রশ্ন করেছি যে কীসের ভিত্তিতে আমাদের উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ বলা হলো।
তিনি বলেন, তিনি (শতাব্দী) নিজেও আওয়ামী লীগ। আমরা যখন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলাম, তখন তিনি জয় বাংলা, মৌলবাদ নিপাত যাক এসব স্লোগান দেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, এ ঘটনা আমরা যাচাই-বাছাই করছি। শিক্ষার্থীকে চড় মারা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছি। বইমেলায় আতঙ্ক ছড়ানোর সুযোগ নেই। এখানে কোনো ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি। এরপর শতাব্দী ভব আবার সবার সামনে আসেন এবং ক্ষমা চান। পরে পুলিশ তাকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
সূত্রে আরও জানা যায়, ঘটনাটির আগেই আজ নিজের ‘মাতাল ভব’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক ভিডিওতে শতাব্দী ভব বলেন, আজ থেকে তসলিমা নাসরিনের বই ‘চুম্বন’ বইমেলা থেকে নিষিদ্ধ হলো এবং তসলিমা নাসরিনও বইমেলা থেকে নিষিদ্ধ হলো।
এ ঘটনা নিয়ে বইমেলা টাস্কফোর্সের সচিব সেলিম রেজা বলেন, সেখানে মব থামানোর জন্য সাময়িকভাবে স্টলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমাদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে এক পোস্টে তদন্তের দাবি জানিয়ে মাযহারুল ইসলাম বলেন, আমাদের ক্ষোভ জয় বাংলার স্লোগানের প্রতি। আমাদের ক্ষোভ খুনির সহযোগী সব আওয়ামী লীগের প্রতি! আর কিছুই না! সুতরাং আমাদের ভুল না বুঝে আপনারা আমাদের দাবির পক্ষে থাকবেন!



