নিউজ ডেস্ক: সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাহরুয়ার আহমেদ ইমন হত্যার দায়ে ২২ বছর বয়সী এক যুবককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির লারনাকার স্থায়ী ফৌজদারি আদালত।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দেওয়া রায়ে আসামি পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ স্বীকার করায় তাকে এই সাজা দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডটি চলতি বছরের জুনে লারনাকা জেলার কোফিনু এলাকায় ঘটে।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, নিহত শাহরুয়ার আহমেদ ইমনও ২২ বছর বয়সী ছিলেন। তিনি সাইপ্রাসে পড়াশোনা করতেন এবং লারনাকা এলাকায় বসবাস করতেন। ৭ জুন একটি বাসযাত্রার সময় ইমনের সঙ্গে অভিযুক্ত যুবকের পরিচয় হয়। তাদের মধ্যে যোগাযোগের তথ্য বিনিময় হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই পরিচয়ই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটায়।
আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ৯ জুন অভিযুক্ত একটি ছুরি কেনেন। এরপর ১১ জুন তিনি ইমনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, তার জন্য দৈনিক ৫০ ইউরো বেতনের একটি চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। চাকরির প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ইমন সেদিন সন্ধ্যায় কোফিনু এলাকায় যান। সেখানে অভিযুক্ত তাকে একটি নির্জন এলাকার দিকে নিয়ে যায়।
পরে কোফিনুর একটি কসাইখানার কাছাকাছি এলাকায় ইমনের ওপর ছুরি দিয়ে হামলা চালানো হয়। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তার শরীরে ছুরিকাঘাতের পর তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ অন্য একটি স্থানে নিয়ে গিয়ে খড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।
হত্যার পর ঘটনাটিকে অপহরণের ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। ইমনের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তার বাবার কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। প্রথমে ৩৫ হাজার ইউরো দাবি করা হয়। পরে ১০ হাজার ইউরো না দিলে ইমনের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয় বলে আদালতে তথ্য উঠে আসে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ইমনের বাবা হত্যাকাণ্ডের দিন একটি বার্তা পেয়েছিলেন, যেখানে তাকে দ্রুত ছেলেকে বাঁচানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। এর পরপরই অর্থ দাবির বার্তা আসে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং পুলিশকে জানান।
ইমন ১৬ জুন স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরার একটি সরকারি কর্মসূচির আওতায় সাইপ্রাস ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি লারনাকা বিমানবন্দরে উপস্থিত হননি। পরে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ কোফিনু এলাকায় তার মোবাইল ফোনের অবস্থান এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে।
তদন্তের একপর্যায়ে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ কোফিনু এলাকায় ইমনের মরদেহের অবস্থান শনাক্ত করে। ২১ জুন মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি ও নিহতের কিছু ব্যক্তিগত সামগ্রীও উদ্ধার করেন বলে আগের শুনানিতে জানানো হয়েছিল।
ময়নাতদন্তে ইমনের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, তার ডান কাঁধের পেছনের অংশে তিনটি কাটা জখম এবং গলার বাম পাশে একটি ক্ষত ছিল। চিকিৎসা-তদন্তে ছুরিকাঘাত ও শ্বাসরোধ—দুই ধরনের আঘাতই মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়।
আসামির বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যা ছাড়াও অপহরণ, বেআইনিভাবে আটক এবং হুমকি দিয়ে সম্পদ আদায়ের মতো একাধিক অভিযোগ ছিল। তবে আদালতে পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগে দোষ স্বীকার করার পর ওই মূল অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং অন্যান্য অভিযোগের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
আদালতের নথি ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১১ জুন ইমন চাকরির আশায় অভিযুক্তের সঙ্গে কোফিনু এলাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই চাকরির প্রস্তাব ছিল হত্যাকাণ্ড সংঘটনের জন্য তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশল। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার পরিবারের কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হয়।-
ইমনের মৃত্যুর ঘটনায় সাইপ্রাসে বসবাসরত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে আদালতের রায়ে হত্যার দায় স্বীকারকারী আসামির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের মাধ্যমে মামলার গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবারের রায়ে লারনাকার স্থায়ী ফৌজদারি আদালত তাকে হত্যার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। সূত্র: সাইপ্রাসমেইল




