নিউজ ডেস্ক : মাঠে নেই কৃষিশ্রমিকের দীর্ঘ সারি, নেই হাতে হাতে জমি পরিদর্শনের ব্যস্ততা। আকাশে উড়ছে কৃষি ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে চলছে কৃষিযন্ত্র, আর স্মার্ট সেচব্যবস্থা প্রয়োজনমতো জমিতে পানি দিচ্ছে। দূরে বসে স্মার্টফোনের মাধ্যমে পুরো কৃষিকাজের ওপর নজর রাখছেন মাত্র দুই তরুণ অপারেটর। চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের ইউলি কাউন্টির একটি তুলাক্ষেত্রে এমনই প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিচিত্র এখন বাস্তবতা।
প্রায় ৩ হাজার মু বা ২০০ হেক্টর আয়তনের এই ‘সুপার কটন ফিল্ড’ মূলত স্মার্ট কৃষির একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প। ২০২১ সালে দক্ষিণ চীনের গুয়াংজু-ভিত্তিক একটি কৃষি রোবটিকস কোম্পানি প্রকল্পটি শুরু করে। লক্ষ্য ছিল এমন একটি কৃষি মডেল তৈরি করা, যেখানে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় আকারের জমি কম জনবল দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
৭৫ শতাংশ কৃষিকাজ স্বয়ংক্রিয়
প্রকল্পটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলকারী কৃষিযন্ত্র, কৃষি ড্রোন এবং স্মার্ট সেচব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ে পুরো বপন থেকে ফসল সংগ্রহের চক্রে প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।
প্রকল্পের অপারেটর আই হাইপেং জানান, প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষিকাজের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জমিতে চারার অবস্থা হাতে হাতে পরীক্ষা করতে যেখানে প্রায় তিন দিন সময় লাগতে পারে, সেখানে স্বয়ংক্রিয় ড্রোন মাত্র অর্ধেক দিনে একই কাজ সম্পন্ন করতে পারে। ড্রোন দ্রুত চারার ঘাটতি, সেচের পানির লিকেজ, আগাছা ও রোগ-পোকার সম্ভাব্য উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে।
কমেছে পানি, সার ও শ্রমের খরচ
স্মার্ট কৃষির সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো উৎপাদন ব্যয় কমানো। ইউলির এই তুলাক্ষেতে প্রচলিত কৃষিপদ্ধতির তুলনায় পানি, সার, কীটনাশক ও শ্রম বাবদ প্রতি মুতে ২৫৪ ইউয়ান বা প্রায় ৩৭ মার্কিন ডলার পর্যন্ত খরচ কমেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে সংশ্লিষ্ট ব্যয় প্রায় ২২ শতাংশ কমেছে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় তুলার উৎপাদনও প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ শুধু শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমানো নয়, একই জমি থেকে বেশি উৎপাদন এবং কম ব্যয়ে কৃষিকাজ পরিচালনার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
ইউলির মডেল ছড়িয়ে পড়ছে
ইউলি কাউন্টির পরীক্ষামূলক প্রকল্পটি এখন আর একটি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে নেই। সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউলির এই স্মার্ট কৃষি মডেল শিনজিয়াংয়ের ২০ লাখ মু বা প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে অনুসরণ করা হয়েছে।
এটি শিনজিয়াংয়ের বৃহত্তর কৃষি রূপান্তরের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অঞ্চলটির কৃষিতে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, ড্রোন, ডিজিটাল নজরদারি এবং নির্ভুল সেচব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে।
তুলা উৎপাদনে শিনজিয়াংয়ের বড় ভূমিকা
শিনজিয়াং চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চল এবং বিশেষ করে তুলা উৎপাদনের জন্য পরিচিত। ২০২৫ সালে অঞ্চলটিতে তুলার উৎপাদন ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৬১ লাখ ৬০ হাজার টনে পৌঁছায় বলে সিনহুয়া জানিয়েছে। এটি চীনের মোট তুলা উৎপাদনের ৯২ দশমিক ৮ শতাংশ।
একই বছরে শিনজিয়াংয়ে শস্য উৎপাদন দাঁড়ায় ২ কোটি ৪৩ লাখ ২০ হাজার টন। অঞ্চলটির শস্য উৎপাদন টানা অষ্টম বছরের মতো বেড়েছে এবং হেক্টরপ্রতি উৎপাদন টানা দুই বছর চীনের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
জাতীয় ডিজিটাল কৃষি নীতির অংশ
শিনজিয়াংয়ের এই প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি উদ্যোগকে চীনের বৃহত্তর কৃষি আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীন স্মার্ট কৃষির জন্য জাতীয় পর্যায়ে ডেটা প্ল্যাটফর্ম, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিযন্ত্র, প্রদর্শনী অঞ্চল এবং ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করছে।
সাম্প্রতিক সরকারি পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ আধুনিকায়নে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। কৃষি প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ব্যাংক ঋণ এবং অন্যান্য অর্থায়ন ব্যবস্থার সম্প্রসারণের কথাও পরিকল্পনায় রয়েছে।
এর পাশাপাশি কৃষকদের আয় স্থিতিশীল রাখা এবং খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করতে চীন কৃষি বীমা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করছে। ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় কৃষকদের জন্য আরও কার্যকর আর্থিক সুরক্ষা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষিতে ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার
চীনের স্মার্ট কৃষি উদ্যোগে কৃষি ড্রোন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে। শিনজিয়াংয়ের তুলাক্ষেত্রে ড্রোন শুধু জমি পর্যবেক্ষণই করছে না; ফসলের বৃদ্ধি, আগাছা, রোগ-পোকা এবং সেচব্যবস্থার ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করতেও ব্যবহার হচ্ছে।
সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ চীনের কৃষি উৎপাদনের ৬৪ শতাংশের বেশি প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েছে। একই সময়ে ফসল উৎপাদনে সামগ্রিক যান্ত্রিকীকরণের হার ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে এবং দেশটির কৃষি ড্রোনের সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়েছে।
সামনে আরও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির পরিকল্পনা
শিনজিয়াংয়ের কৃষি কর্তৃপক্ষ আগামী পাঁচ বছরে কৃষি প্রযুক্তি ও আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোননির্ভর নিম্ন-উচ্চতা অর্থনীতি এবং স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থার ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চীনের ২০২৪-২০২৮ সালের জাতীয় স্মার্ট কৃষি কর্মপরিকল্পনাতেও বড় আকারের ফসল উৎপাদনে ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃষি-বিগ ডেটা, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র এবং স্মার্ট খামারের প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।-
সব মিলিয়ে শিনজিয়াংয়ের ইউলি কাউন্টির ৩ হাজার মু তুলাক্ষেত্রটি দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের কৃষি শুধু জমি ও শ্রমনির্ভর থাকবে না; বরং ডেটা, ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, স্মার্ট সেচ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে কৃষি উৎপাদনের নতুন মডেল তৈরি হতে পারে। কম জনবল দিয়ে বড় জমি পরিচালনা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং ফলন বাড়ানোর এই প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি চীনের কৃষি আধুনিকায়নের বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। সূত্র : সূত্র : পিপুলস্ ডেইলি



