নিউজ ডেস্ক: আজ ১০ এপ্রিল সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধিতে বক্তব্য প্রদানকালে আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির চালচিত্র তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আওয়ামী লীগ সরকারের অপশাসন, ভ্রান্ত নীতি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকার অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করানোর পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকারের দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো যেখানে ইতিবাচক ধারায় নিয়ে এসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করে গিয়েছিল, বিগত ১৬ বছরে তা অনেকটাই ধুলিস্যাৎ করা হয়েছে।
মন্ত্রী বিগত সরকারের আমলে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকসমূহের বাস্তব চিত্র সংসদের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে অর্থাৎ ৭ দশমিক ১৭ শতাংশে। পরবর্তীতে দুর্বৃত্তায়ন ও ভ্রান্ত নীতির কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪.২২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। ২০০৫-০৬ সালে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৬৬ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে সেটা নেমে এসেছে মাত্র ৩.৫১ শতাংশে। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৭৭ শতাংশ, তা ২০২৩-২৪ সালে কমে হয়েছে ৩.৩০ শতাংশ। ২০০৫-০৬ সালে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৬৬ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে সেটা নেমে এসেছে মাত্র ৩.৫১ শতাংশে। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৭৭ শতাংশ, তা ২০২৩-২৪ সালে কমে হয়েছে ৩.৩০ শতাংশ।
কর্মসংস্থান সম্পর্কে মন্ত্রী জানান, একটি অর্থনীতি যখন শিল্পের চালিকাশক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। বিগত সময়ে এটি চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।
তিনি জানান, বিগত এক দশকে কৃষিখাতে মূল্য সংযোজনের অংশ কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ, আর শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষি খাতেই বেশি করে নিয়োজিত হয়েছে। এতে করে ছদ্ম-বেকারত্ব তীব্রতর হয়েছে এবং তরুণদের শ্রমশক্তি অপচয় হয়ে তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করছে।
সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বিষয়ে জানান, ২০০১-২০০৬ সময়ে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখতে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে জাতীয় সঞ্চয় জিডিপির ২৯.৯৪ শতাংশ এবং মোট বিনিয়োগ ছিল ২৮.৭৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে এই চিত্র উল্টে গেছে। বিনিয়োগ সঞ্চয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত চাহিদা বৈদেশিক উৎস হতে সংস্থান করা হয়েছে। ফলে বহিঃখাতের উপর চাপ বেড়েছে।
টাকার বিনিময় হার সর্ম্পকে জানান, ২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৭.২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে সেটা হয়েছে ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ টাকায়। ক্রমাগত অবচিতির কারণে ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে।
ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করেছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতাকে কমিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ।
তিনি জানান, আওয়ামী লীগ আমলে শুধু বাজেট ঘাটতি যে বেড়েছে তাই নয়, এ বৃদ্ধির মানও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত এবং এগুলির সম্ভাব্যতা যাচাইও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে করা হয়নি। তাদের বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। ফলশ্রুতিতে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারেননি। লুটপাটের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত ‘শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’র প্রতিবেদনে বিষদভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি জানান, বিগত আওয়ামী সরকারের সময় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভাতা প্রদান করা হলেও এর কাভারেজ ও ভাতার পরিমাণ মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিকীকরণ করা হয়নি। এতে উপকারভোগীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বাইরে থেকে গেছে, যা ক্রমান্বয়ে বৈষম্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। উপকারভোগী নির্বাচনেও দলীয়করণ ও দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ে মন্ত্রী জানান, বিগত সময়ে বিভিন্ন আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি এবং তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অর্থনীতির ব্যাকবোন হিসেবে খ্যাত আর্থিক খাত ধ্বংসের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।
২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩.৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.২০ শতাংশে। খেলাপি ঋণের আন্তর্জাতিক ভাবে অনুসৃত সংজ্ঞাকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে ভুলভাবে প্রদর্শন করে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত চিত্র গোপন করা হয়েছে।




