মোঃ গোলাম মোস্তফা
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি আবারও বিশ্বকে অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ Strait of Hormuz নতুন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিপদের মুখে ফেলে দিতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump ঘোষণা দিয়েছেন যে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে “অনেক দেশ” যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে পারে। সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী হিসেবে তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যের নাম উল্লেখ করেছেন। তার এই বক্তব্য মূলত একটি আন্তর্জাতিক নৌজোট গঠনের ইঙ্গিত দেয়, যার লক্ষ্য হবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই পথটি সচল রাখা।
অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি; বরং এটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং “শত্রু দেশ ও তাদের মিত্রদের জাহাজের জন্য” সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা Islamic Revolutionary Guard Corps-এর কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকে অতিরঞ্জিত বলেও মন্তব্য করেছেন।
এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে কেবল সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না; বরং এটি দ্রুত একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। কারণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ বা অকার্যকর হয়ে পড়লে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন এবং জ্বালানি-নির্ভর শিল্পে ব্যাপক চাপ—সবকিছুই এর সম্ভাব্য পরিণতি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নৌবাহিনী বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়; বরং এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে ঝুঁকি তৈরি করার ক্ষমতা। সামান্য ড্রোন হামলা, মাইন পাতা বা ক্ষুদ্র নৌযান দিয়ে আক্রমণের আশঙ্কাই আন্তর্জাতিক বীমা কোম্পানি ও শিপিং কোম্পানিগুলোকে জাহাজ পাঠাতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। ফলে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করা সম্ভব।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কিছু দেশ ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সীমিত নৌ চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, Narendra Modi ও ইরানের প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian-এর আলোচনার পর ভারতীয় জাহাজকে প্রণালী অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক দরকষাকষি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
অতএব, হরমুজ প্রণালী সংকট আজ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে আধুনিক বিশ্বের ভূরাজনীতিতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পথনির্ভরতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব শক্তিগুলোর সামনে এখন প্রধান প্রশ্ন হলো—এই সংকট কি আরও বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে, নাকি কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পথ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে? সেই উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ।
ভাষান্তর ও সংকলন : মোঃ গোলাম মোস্তফা
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সাবেক পরিচালক, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, আইন সম্পাদক, রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, গণফোরাম এবং ডেমোক্র্যাটিক লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (IADL অনুমোদিত)




