ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeলিড'হিজাব বিতর্ক ও রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি' সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা

‘হিজাব বিতর্ক ও রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি’ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে হিজাব ও পোশাক নিয়ে কথিত মন্তব্যের অভিযোগ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে কালি লেপনের চেষ্টার ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের ৩৭ বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁদের অভিযোগ, ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে সামাজিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

বুধবার দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা এসব ঘটনার নিন্দা জানান। একই সঙ্গে ঘটনা দুটির সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৭ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সুমি আক্তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা ও পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেন সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব। নিকাব পরা এক শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ করে তিনি পর্দা করা, মুখ খোলা রাখা এবং হাত-পা ঢাকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মন্তব্য করেন বলেও অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনার পর ওই শিক্ষার্থীসহ আরও দুজন ক্লাস থেকে বের হয়ে যান। পরে একটি ছাত্রসংগঠনের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

তবে বিবৃতিতে বলা হয়, এ ঘটনা সম্পর্কে অন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভিন্নমত পাওয়া গেছে। তাসনীম সিরাজ মাহবুবও নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া ব্যাখ্যায় দাবি করেন, তিনি কোনো শিক্ষার্থীকে পোশাক পরিবর্তন করতে, নিকাব খুলতে কিংবা ক্লাস ত্যাগ করতে নির্দেশ দেননি। নিকাবের কারণে শিক্ষার্থীর চোখ দেখতে না পাওয়ায় তাঁকে শনাক্ত করা ও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে অসুবিধা হচ্ছিল বলে তিনি নিজের অস্বস্তির কথা জানিয়েছিলেন। শিক্ষার্থী কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখ প্রকাশের জন্য তাঁকে ডেকে পাঠানোর কথাও জানান ওই শিক্ষক।

বিবৃতিদাতারা বলেন, পোশাকের স্বাধীনতা ব্যক্তিস্বাধীনতার অংশ। এ নিয়ে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি হয়ে থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক তৈরির শামিল।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত ৯ অক্টোবর ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর ব্যানারে কয়েকজন যুবক ও এক তরুণী ‘ভারতীয় আগ্রাসনের’ প্রতিবাদের নামে শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে কালি লেপনের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ তাঁদের নিবৃত্ত করে।

এর আগে ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি আঁকা হয়। পরে ‘জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এসব প্রতিকৃতি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বিবৃতিদাতারা শিল্প-সংস্কৃতির ওপর এ ধরনের আক্রমণকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, ঘটনা দুটি আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও এর মধ্যে উদ্দেশ্যের অভিন্নতা রয়েছে। একটি মহল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতিকে পুঁজি করে ধর্মান্ধতা উসকে দিয়ে সামাজিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টিতে পরিকল্পিতভাবে তৎপর।

নাগরিকেরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে অভিযোগ তুলে শাস্তি দাবি করা যেমন আপত্তিকর, তেমনি বিশ্বকবি ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অসম্মান করার চেষ্টাও দুরভিসন্ধিমূলক। ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকেরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথকে মুসলিমবিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপনের যে অপপ্রচার চালিয়েছিল, তাঁর ছবিতে কালি লেপনের চেষ্টা সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে তাঁরা মনে করেন।

তাঁদের মতে, ভাষা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি মানুষের অবিভাজ্য সম্পদ। ধর্ম, ভৌগোলিক সীমানা কিংবা বিশেষ কোনো মতাদর্শের ভিত্তিতে এসব সম্পদ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে আলাদা করে বিচার করা যায় না।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, মানবাধিকারকর্মী ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির, নারীপক্ষের সদস্য শিরীন পারভিন হক, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজীমউদ্দিন খান, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।

এ ছাড়া রয়েছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের ভিজিটিং প্রফেসর ড. স্বপন আদনান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নোভা আহমেদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফিরদৌস আজিম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ তানজীম তিতিল, লেখক রেহনুমা আহমেদ, সাংবাদিক ও গবেষক সায়দিয়া গুলরুখ, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক ড. ঈশিতা দস্তিদার, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী সাদাফ নুর, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথ, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির, কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস, কবি ও আদিবাসী সংস্কৃতিকর্মী মিঠুন রাকসাম, কবি ও আদিবাসী কর্মী হাফিজ রশিদ খান, মানবাধিকারকর্মী সাঈদ আহমেদ ও দীপায়ন খীসা, অধিকারকর্মী ড. হানা শামস আহমেদ এবং মুক্তাশ্রী চাকমা।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular