ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআন্তর্জাতিকদিল্লিতে মোদি-পুতিন-শি, ব্রিকস সম্মেলনে ট্রাম্পের ছায়া

দিল্লিতে মোদি-পুতিন-শি, ব্রিকস সম্মেলনে ট্রাম্পের ছায়া

নিউজ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ব্রিকসের সদস্য নয়, তবু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের প্রভাবেই এবার নয়াদিল্লিতে বসতে যাচ্ছে ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানীতে অনুষ্ঠিতব্য এ সম্মেলনে ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরানসহ সম্প্রসারিত ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর নেতারা অংশ নিচ্ছেন।

সম্মেলনের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একই সময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজনও করছে দুই দেশ। ফলে ব্রিকস সম্মেলন শুধু বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক জোটের বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; ভারত-রাশিয়া, ভারত-চীন এবং বৃহত্তর বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবেও এর গুরুত্ব বাড়ছে।

ট্রাম্পের নীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ

ব্রিকস সম্মেলনের পটভূমিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। ইরান ২০২৪ সালে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জোটটির অভ্যন্তরীণ সমীকরণকে আরও জটিল করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের প্রভাব আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে চাপ তৈরি করেছে এবং অপরিশোধিত জ্বালানির দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শুল্কনীতি উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। সম্মেলনের আগে ব্রিকসের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা সীমান্তপারের অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার পাশাপাশি মার্কিন শুল্কনীতির বিরূপ প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ঐক্যের চেয়ে বিভাজনই বড় চ্যালেঞ্জ

ব্রিকস সম্প্রসারিত হওয়ার ফলে জোটটির আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়লেও সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্যও বেড়েছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার সংঘাত তার একটি বড় উদাহরণ। ইরানের হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে ব্রিকসের একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই বিভাজনের কারণে সম্মেলন শেষে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি লক্ষ্য করে শক্ত কোনো যৌথ বিবৃতি আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে ভারত ও চীন—দুই দেশই ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিজ নিজ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনায় রেখে অবস্থান নিতে চাইবে।

ভারত একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে এবং রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ফলে নয়াদিল্লির জন্য ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া কূটনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

মোদি-পুতিন বৈঠকে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা

ব্রিকস সম্মেলনের আগে মোদি ও পুতিনের বৈঠক দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের গুরুত্বও সামনে এনেছে। বৈঠকে জ্বালানি, প্রতিরক্ষা এবং পশ্চিম এশিয়া ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের সংঘাত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুই নেতা ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।

রাশিয়ার তেল ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ রেকর্ড ৫১ শতাংশে পৌঁছায় বলে Reuters জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো রুশ তেলের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়েছে।

দুই দেশ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে।

শি-মোদি বৈঠকেও নজর

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এবারের ভারত সফরও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাত বছর পর তাঁর ভারত সফর হচ্ছে। সীমান্ত উত্তেজনার পর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হলেও ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো অবিশ্বাস, নিয়ন্ত্রক বাধা ও ভিসা জটিলতা রয়েছে।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শি ও মোদির বৈঠকের আয়োজন করছে দুই দেশ। বেইজিং বলছে, তারা দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে ভারত-চীন সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে চায়।

ফলে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শি-মোদি বৈঠক দুই দেশের সীমান্ত ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ডি-ডলারাইজেশন নিয়েও বিতর্ক

ব্রিকসের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো বা ‘ডি-ডলারাইজেশন’। এ উদ্যোগকে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহের চোখে দেখছেন।

তবে সম্মেলনের আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, মস্কো ডি-ডলারাইজেশনকে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে দেখছে না; বরং গ্রহণযোগ্য বিভিন্ন অর্থপ্রদানের পদ্ধতির প্রতি রাশিয়া উন্মুক্ত।

অর্থাৎ ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো বিকল্প অর্থপ্রদান ব্যবস্থা ও নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন বাড়াতে আগ্রহী হলেও এ বিষয়ে সবার অবস্থান এক নয়। এ পার্থক্যও জোটটির অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরছে।

ট্রাম্পের ছায়ায় ব্রিকসের ভবিষ্যৎ

ব্রিকস এখন আগের তুলনায় অনেক বড় ও প্রভাবশালী জোট। কিন্তু সদস্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বার্থের বৈচিত্র্যও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও ইরান যুদ্ধ সদস্যদের কিছু অভিন্ন স্বার্থ তৈরি করলেও ভারত-চীন-রাশিয়া-ইরান-সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিন্ন ভূরাজনৈতিক অবস্থান একক নীতি গ্রহণকে কঠিন করে তুলছে।

ফলে নয়াদিল্লি সম্মেলনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে—ব্রিকস কতটা শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ বার্তা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান না নিয়েও বৈশ্বিক বাণিজ্য, অর্থব্যবস্থা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে জোটটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর।-

দিল্লির এই সম্মেলনে তাই শুধু মোদি, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের উপস্থিতিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং ট্রাম্পের নীতির চাপের মধ্যে ব্রিকস নিজেদের কতটা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে—সেটিই হতে পারে এবারের বৈঠকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা।

আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular