• ঢাকা
  • শনিবার, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ; ০২ মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image
website logo

শত বছর আগের বিলাসবহুল ট্রেন সৈয়দপুরে


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: শনিবার, ১৩ আগষ্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০১:১৪ পিএম
শত বছর আগের
সৈয়দপুরে বিলাসবহুল ট্রেন

নিউজ ডেস্ক : পুরোটাই সেগুন কাঠের। চমৎকার রং আর বৈচিত্র্যপূর্ণ নকশা সেই কাঠজুড়ে। প্রতিটি কামরায় রয়েছে কারুকার্যখচিত খাট, কাপড় রাখার আলমারি, নান্দনিক ডিজাইনের লাইটিং, ফ্যান, এসি ও দামি ফার্নিচার। লালগালিচায় মোড়ানো কাঠের ছয় কামরা।

বোঝাই যায় না, এগুলো শত বছর আগের তৈরি। ব্রিটিশ আমলের এসব আসবাব বর্তমান সময়ের আধুনিকতাকেও হার মানায়। বলছিলাম ব্রিটেনের রানির বিলাসবহুল ট্রেনের কথা। রূপকথার মতো অনিন্দ্য ছয় কামরাবিশিষ্ট কাঠের এই ট্রেনটি আজও সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় রয়েছে।

১৯২৭ সালে ব্রিটেনে তৈরি হয়েছে এই ছয় কামরাবিশিষ্ট বিলাসবহুল কোচ ১২৬৫। ব্রিটেনের রানির ভারত ভ্রমণের জন্য এই ট্রেন এ উপমহাদেশে আনা হয়।

পুরো ট্রেনটিই সেগুন কাঠের তৈরি। ১০০ বছর পেরিয়ে গেলেও রং আর কাঠের গায়ে খোদাই করা আলপনা আজও সবাইকে মুগ্ধ করে। কাঠগুলো এখনো চকচক করে। যেন বেলজিয়ামের গ্লাস। এগুলো এতটাই উন্নত যে, আয়নার বদলে চেহারা দেখার কাজেও ব্যবহার করা যাবে।

সেখানে যেসব ফ্যান ব্যবহার করা হয়েছে তা আর কোথাও নেই। এক শতাব্দী পরও ফ্যানের বাতাস এসির চেয়েও ঠান্ডা, পাঠককে এই কথা বিশ্বাস করতেই হবে। প্রতিটি কক্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঝাড়বাতি টানানো আছে। আলো ঝলমলে ট্রেনের ঝাড়বাতিগুলো খুবই রাজকীয়, নান্দনিক কারুকার্যখচিত বেশির ভাগই পিতল আর তামার তৈরি।

ছয় কামরাবিশিষ্ট এই ট্রেনের প্রথমটি হলো নিরাপত্তাকর্মীদের থাকার জন্য। এরপর রানির সঙ্গে আগত পাইক-পেয়াদা ও অফিশিয়াল স্টাফদের জন্য থাকার কক্ষ। প্রতিটি কক্ষেই আছে কাঠের তৈরি কারুকার্যখচিত খাট, কাপড় রাখার আলমারি, নান্দনিক ডিজাইনের লাইটিং, ফ্যান, এসি ও দামি ফার্নিচার।

এরপরের কক্ষটি রানির জন্য বরাদ্দ ছিল। সেখানে আছে খাট, ফোল্ডিং বেসিন। দোতলা আলমারি, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখার জন্য তামার তৈরি ছোট ছোট দুটি পাত্র। ঝাড়বাতি। বলে রাখি, পুরো ট্রেনটিই লাল মখমলের কার্পেটিং করা।

দেখলেই বোঝা যায় এর আভিজাত্য ও জৌলুস। প্রতিটি কক্ষের সঙ্গে একটি করে অ্যাটাচ বাথরুম ও বেলজিয়ামের উন্নত স্যানিটারি ফিটিংস দেয়া আছে। সেগুলো এখনো এতটাই উন্নত ও আধুনিক যে, এই আধুনিক সময়ে সচরাচর অমন ডেকোরেশন চোখে পড়ে না। কল্পনাতীত বিলাসিতা ট্রেনজুড়ে।

এরপর আরও বিস্ময় রানির স্নানঘরে। এক কক্ষজুড়ে স্নানঘর। পুরো কক্ষটিই যেন ফাইভস্টার হোটেলের আদলে গড়া। পুরো দেয়াল উন্নতমানের ছোট ছোট টাইলসে বাঁধানো, সিমেন্ট বা বালু দিয়ে না, স্ক্রু দিয়ে আটকানো প্রতিটি টাইলস। সিলিংও সবুজাভ টাইলস মোড়ানো। মেঝেতে কাঠের ওপর মোজাইক। আছে সেই আমলের উন্নত হাই কমোড, সেখানকার ঝাড়বাতিগুলোও নকশা করা, কালারফুল ও নান্দনিক। দেয়ালজুড়ে তামা-পিতলের আলপনা। সাবান-শ্যাম্পু আর ব্রাশ রাখার জন্য আছে তামার তৈরি নান্দনিক ঝুড়ি, যাতে গৌরবময় আভিজাত্য ফুটে ওটে। সেই ওয়াশরুমে আছে বিশাল সবুজ মার্বেলের বাথটাব, আছে পিতলের ঝরনা। সে সময়ের বানানো ট্রেনে ভাবা যায় এসব!

এরপরের কক্ষটি রানির সভাকক্ষ। অন্যগুলোর তুলনায় বেশ বড়। দুটি বড় সোফা রাখা আছে সেখানে, সেই সোফার সামনে আছে ৮ থেকে ১০টি চেয়ার। যার সব কটিই সেগুন কাঠের তৈরি। রানি চলন্ত ট্রেনে উচ্চ অফিশিয়ালদের নিয়ে মিটিং করতেন। একই রকম কারুকার্য দেয়ালজুড়ে। লালগালিচা আর সাদা কাপড় দিয়ে মোড়ানো পুরো কনফারেন্স রুম। সেখানে কক্ষের সঙ্গে লাগানো আলমারিতে আছে ডিংকস কেস, মদের বোতল রাখার তাক, আছে সিগারেটের ছাইদানি। বিশাল কারবার সেখানে। রানির রুমের মতো সেখানেও আছে এসি, উন্নত কাঠের ফার্নিচার আর দামি ঝাড়বাতি।

এর পরের কামরাটি বাবুর্চিদের থাকার জন্য। সেখানেও কাঠের দুটি খাট রয়েছে। সেখানে একই রকম আভিজাত্যের প্রমাণ মেলে। এমন আভিজাত্য ট্রেনের মধ্যে ঘুরলেও অজানা শিহরনে বারবার শিহরিত হবে যে কেউ।

এর পরের কক্ষটি রান্নাঘর। সেখানে কয়লার চিমনি, কয়লা দিয়ে রান্না হতো রানির জন্য। কয়লার ধোঁয়া বাইরে নেয়ার জন্য আছে আলাদা গ্যাস চেম্বার। কী পরিকল্পিত সব কাজ। সেই আমলে রান্নাঘরে দেখলাম রয়েছে ফ্রিজ। মানে, রাজা-বাদশাহ আর রানির ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা।

এই  রেলের কী তার ঐতিহ্য, কী তার গৌরব, কী তার আভিজাত্য ভাবতেই মনে একটা বাদশাহি ভাব চলে আসে।

১৯৭১ সালের পর উত্তরাধিকারসূত্রে এই ট্রেনের মালিক হয় বাংলাদেশ। এরপর থেকে এটি শুধু রাষ্ট্রপতির জন্য সংরক্ষিত থাকায় এর নাম হয় রেলওয়ে প্রেসিডেন্ট সেলুন কোচ এবং দেশের প্রেসিডেন্টদের ট্রেন ভ্রমণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। তখন এটিকে রাষ্ট্রপতি সেলুন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তিনিই একমাত্র এই সেলুন ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৮১ সালে এটি চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়লে মেরামতের জন্য আনা হয় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায়।

বর্তমানে ট্রেনটি রাখা আছে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায়। সেখানে কিছু জিনিস মেরামত করে সাধারণ মানুষ ও দর্শনার্থীদের জন্য নেয়া হবে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় নবনির্মিত জাদুঘরে।

ঢাকানিউজ২৪.কম / কেএন

আরো পড়ুন

banner image
banner image