ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআলোকিত মুখজলপ্রবাহের ক্যানভাসে চেতনার লেন্স: ‘নদীলিপি’ প্রদর্শনীর দ্বিতীয় সন্ধ্যা

জলপ্রবাহের ক্যানভাসে চেতনার লেন্স: ‘নদীলিপি’ প্রদর্শনীর দ্বিতীয় সন্ধ্যা

সংস্কৃতি ডেস্ক: রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ঢাকা গ্যালারিতে উন্মুক্ত হওয়া বহুমুখী চিত্রশিল্পী রাশিদ খানের একক চিত্রপ্রদর্শনী ও শিল্প-লেখক জাভেদ জলিলের কিউরেটোরিয়াল আয়োজনে চলছে ‘নদীলিপি :  রিভার স্ক্রিপ্ট (River Script)’।

প্রথাগত কোনো ফিতা কাটার আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই শুরু হওয়া ১৫ দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীর প্রথম দিকে লোকস্বল্পতা থাকলেও, গত ৬ নভেম্বর শুক্রবার দ্বিতীয় দিনে সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় ঢাকা গ্যালারি প্রাঙ্গণে চিত্রপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

ছাদ থেকে ঝুলানো তাম্রাভ জাল, ফিরোজা ও পলির উষ্ণ রঙে আঁকা ক্যানভাস, আর সাদা-কালো আঁচড়ের দ্যগতিময়তার মুখোমুখি হয়ে দর্শকরা প্রবেশ করেন এক ভিন্নতর নদী-চেতনায়।

এই প্রদর্শনীতে প্রায় ৬০টির মতো চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে, যার মধ্যে মূলত চিত্রা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, রূপসা, তিস্তা, ভৈরব, পায়রা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, যমুনা, কপোতাক্ষ, মধুমতি, ধরলা, বুড়িগঙ্গা, হালদা এবং পানগুছি—এই মোট ১৬টি নদীর বিভিন্ন সময়ের রূপ যেমন সন্ধ্যা ও দিনের বেলার আলোকছায়া ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

চিত্রকর্মগুলো ফুটিয়ে তুলতে শিল্পী অ্যাক্রিলিক অন ক্যানভাস, অ্যাক্রিলিক অয়েল ক্যানভাস, ওয়াটার অন পেপার, অ্যাক্রিলিক অন স্যান্ড পেপার, মিক্সড মিডিয়া, চারকোল অন ক্যানভাস এবং পেন্সিল অন পেপার বোর্ডের মতো বিভিন্ন মাধ্যম বা মিডিয়াম ব্যবহার করেছেন।

ক্যানভাসজুড়ে রূপ পেয়েছে নদীর নান্দনিকতা ও একই সাথে এর বেদনার ইতিহাস। পুরনো স্টিমার, লঞ্চ, নৌকা আর বাউলদের ছবি দর্শনার্থীদের এক দূর অতীতের স্বর্ণালী নস্টালজিয়ায় নিয়ে যায়।

তবে এর পাশাপাশি আলাদাভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে বুড়িগঙ্গার বর্তমান করুণ চিত্র। অতীতে নদীটির যে প্রাণবন্ত রূপ মানুষ দেখেছে, তার বিপরীতে আজকের বুড়িগঙ্গার দখল, দূষণ, জমে থাকা কৃত্রিম বর্জ্য, দুর্গন্ধ এবং বিষাক্ত পানির ভয়াবহ পরিস্থিতি ক্যানভাসে তুলে ধরা হয়েছে।

শিল্পীর ‘Turmoil: The Present River’ (বস্তাপচা জল ও টার্ময়েল) কিংবা ‘পলিথিনে রুদ্ধশ্বাস’ শীর্ষক চিত্রে সেই বস্তাপচা জল আর নদীর রুদ্ধশ্বাস অবস্থাকেই নির্দেশ করা হয়েছে—যা দেখে উপস্থিত দর্শক ও শিল্পবোদ্ধারা গভীরভাবে আলোড়িত হন।

শিল্পী রাশিদ খানের অন্তরের গভীর চিন্তা ও মূল ভাবনা ক্যানভাস ও ক্যাটালগে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাশিদ খান এর কথায়—”আমাদের সবার ভেতরেই একটা নদী প্রবাহিত হচ্ছে। আমি আমার এই চিত্রকর্মের মাধ্যমে আমাদের সবার ভেতরের সেই অভ্যন্তরীণ নদীকেই ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “A river is not simply a subject to see or to paint. It is a lens—a lens through which I see time, people, landscapes, and the evolving stories of life.” ক্যানভাসে তিনি প্রথাগত ল্যান্ডস্কেপ না এঁকে নদীকে একটি ‘লেন্স’ এবং মানুষের জীবনবোধ ও স্মৃতির নীরব সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করেন, যেখানে মূর্ত ও বিমূর্ত রূপের এমন এক পরাবাস্তব সহাবস্থান থাকে যা দর্শককে নিজের ভেতরের অবচেতন নদীর মুখোমুখি দাঁড় করায়।

গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় আয়োজিত প্রদর্শনীর বিশেষ পর্ব ‘নদী সুর’ প্রাঙ্গণটিকে এক আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। অনুষ্ঠানের শুরুতে বেনারস থেকে চিত্রশিল্পে উচ্চতর পড়ালেখা শেষ করে আসা তরুণ শিল্পী তপু বাঁশি নিয়ে নদীকে কেন্দ্র করে তাঁর তৈরি ভিন্ন ভিন্ন চারটি কম্পোজিশন পরিবেশন করে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন এবং চিত্রশিল্প ও সংগীতের গভীর মেলবন্ধন নিয়ে কথা বলেন।

এরপর মঞ্চে আসেন মানিকগঞ্জের নদীর পাশের মানুষ বাউল সাধক শাহজাহান মুন্সী; যিনি নদীবিধৌত ওই এলাকায় ফেরি ও লঞ্চে চড়ে নিজের জীবন কাটিয়েছেন। নদীঘনিষ্ঠ ও সেই জীবনসংগ্রামের তাঁর বাউল গানে দর্শকরা মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।

নদী নিয়ে দীর্ঘদিনের কাজ করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে ফ্রিলেন্স আলোকচিত্রী কাকলী প্রধান করপোরেট ও প্রভাবশালী মহলের নদী দখল এবং সেই নদী ধ্বংসের বিরুদ্ধে ছবি তুলতে গেলে তাঁকে নানাভাবে বাধা দেওয়া ও জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার মতো বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার কষ্টের কথা তুলে ধরেন।

জাভেদ জলিলের সাথে কথোপকথনে তিনি তাঁর ইতিপূর্বে নদী নিয়ে করা চমৎকার কিছু প্রজেক্ট এবং লঞ্চঘাটে নদী নিয়ে তাঁর বহুল প্রশংসিত ফটোগ্রাফি প্রদর্শনীর অভিজ্ঞতা সবার সাথে শেয়ার করেন। আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন চিত্রশিল্পী ও সংগীতশিল্পী সুমনা হক, ব্যান্ড ‘চিরকুট’-এর ভোকালিস্ট সুমি, সংগীতশিল্পী আলিফ, ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহা প্রমুখ ।

অনুষ্ঠানের শেষভাগে শিল্পী রাশিদ খানের বড় ভাই, বিশিষ্ট স্থপতি জাহিদ আই খান ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমরা যখন ক্যাডেট কলেজে পড়তাম, আমি ছিলাম সিনিয়র গ্রুপে আর রাশেদ ছিল জুনিয়র গ্রুপে। সে সময় ছবি আঁকায় আমি সিনিয়র গ্রুপে ফার্স্ট হতাম, আর রাশেদ হতো জুনিয়র গ্রুপে ফার্স্ট। যদিও শেষ পর্যন্ত আমি চিত্রশিল্পী না হয়ে আর্কিটেকচারে চলে গিয়েছি, কিন্তু রাশেদ ঠিকই আর্টকে আঁকড়ে ধরে রেখে আজ একজন সৃজনশীল চিত্রশিল্পী হিসেবে সবার সামনে এসেছে।”

ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “ছোটবেলায় যখন আমরা নদীর উপর  দিয়ে গ্রামের বাড়িতে যেতাম, সেই নদী দেখার অভিজ্ঞতা সে সময়টাতে আমার মনে যতটা না দাগ কেটেছিল, আজ রাশিদের ক্যানভাস ও চিত্রপ্রদর্শনী দেখে বুঝতে পারছি যে সেই জলপ্রবাহ ও নদী তার অন্তরের গভীরে ঠিক কতটা প্রবলভাবে প্রভাব ফেলেছিল।”

প্রদর্শনীতে উন্মোচিত হয়েছে ‘নদীলিপি – দ্য রিভার স্ক্রিপ্টস হোয়ার দ্য রিভার স্পিকস’ শীর্ষক বিশেষ এই আর্ট-পাবলিকেশনটি, যার একটি দর্শনী মূল্য রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা এবং এটি সংগ্রাহকদের জন্য একটি দুর্লভ সংগ্রহ।

বইটিতে রাশিদ খানের ক্যানভাস ও নিজস্ব গীতকবিতা—যেমন ‘নদী দেখতে খুঁজে পাওয়া নদী!’ বা ‘Sentience Rides’—এর পংক্তিগুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে কিউরেটর জাভেদ জলিলের নিবিড় শিল্প-বিশ্লেষণ ও কাব্যিক অনুভূতি। জাভেদ জলিলের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘নদীলিপি’ প্রদর্শনীতে তিনি যুক্ত রয়েছেন কিউরেটোরিয়াল অনুসন্ধান, গ্রন্থনা ও টেক্সট রচয়িতা হিসেবে।

জাভেদ জলিলের লেখার অসাধারণ গভীরতা, শব্দ ও সাহিত্যের মাত্রা প্রতিটি ছবির ভেতরের মর্মকে এক ভিন্নমাত্রায় নিয়ে গেছে। শিল্প এবং শব্দকে তিনি আলাদা মাধ্যম হিসেবে না দেখে দুটির সংমিশ্রণে এক নতুন সংবেদনশীলতার স্থান তৈরি করেছেন।

এই প্রদর্শনীতে তিনি চিত্রশিল্পীকে ‘দ্য এনালগ ড্রিমার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং দৃশ্যশিল্পকে টেক্সট ও সাউন্ডের সাথে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক মানের এক সমন্বিত প্রদর্শনীর রূপ দিয়েছেন।

আগামী ১৫ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় নদীকে কেন্দ্র করে বিশেষ সান্ধ্যকালীন সাংস্কৃতিক আড্ডা ও অনুষ্ঠানমালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আগামী ১০ নভেম্বর মঙ্গলবার বিকেল ৩:০০ টায় জাভেদ জলিলের পরিচালনায় বিশেষ আর্ট ওয়ার্কশপ ‘Art in Everyday Life’ অনুষ্ঠিত হবে এবং সন্ধ্যায় থাকবে ‘নদী পাঠ’।

অন্যান্য দিনের আয়োজনে ৭ নভেম্বর শনিবার ‘নদী সাহিত্য’, ৮ নভেম্বর রবিবার ‘নদী কথা’, ৯ নভেম্বর সোমবার ‘নদী সুর’, ১১ নভেম্বর বুধবার ‘নদী কথা’, ১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ‘নদী গল্প’, ১৩ নভেম্বর শুক্রবার ‘নদী সুর’, ১৪ নভেম্বর শনিবার ‘নদী পাঠ’ এবং ১৫ নভেম্বর রবিবার সমাপনী সন্ধ্যায় ‘নদীলিপি’ শীর্ষক বিশেষ আড্ডার মধ্য দিয়ে এই প্রদর্শনীর সমাপ্তি ঘটবে।

আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular