• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ; ২৫ জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image
website logo

কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তি ও বিদ্যাপতি পালা-নাটিকা


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: শনিবার, ০১ জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ০৭:১২ পিএম
নজরুল ঐতিহ্যবাহী পালার কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে তাঁর ‘বিদ্যাপতি’
কাজী নজরুল ইসলাম

লুৎফর রহমান

বাংলা নাটকের নিজস্ব ও ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন ধারা রয়েছে। সেসব ধারার অন্যতম লেটো, ঘাটুর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল। লেটো দলের কর্মী, অভিনেতা হিসেবে গণমানুষের এসব শিল্পের শক্তি সম্পর্কেও ছিল তাঁর মাঠপর্যায়ের বিপুল অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান। নজরুলের নাটক রচনাকালেও সেসব আঙ্গিক যেমন– পালা, আলকাপ, গম্ভীরা, নাটগীত, গাজীর গান, মাদার পীরের গান, সত্যপীরের পাঁচালি, কথকতা রীতির শাস্ত্রগান বা হাস্তর নগর বাহিরে গ্রামীণ, নিরক্ষর, স্বাক্ষর শ্রমজীবী শ্রেণির বিনোদন ও লোকশিক্ষার উপায় হিসেবে বহুল প্রচলিত ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনের সদস্য হিসেবে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত নজরুল উল্লিখিত সংস্কৃতির মধ্যেই বসবাস করতেন। ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির আগ্রাসন ততদিনে নাগরিক বাঙালির নৈমিত্তিক জীবন ও যাপনের অচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে ইউরোপীয় রীতির নাটকের বয়স তখন ২২৫ বছর। শিক্ষিত বাঙালি দেশজ নাট্যের রূপরীতি বিস্মৃত হয়ে লিয়েভেদেফকেই বাংলা নাটকের জনকের আসনে বসিয়ে অর্ঘ্য নিবেদনে অভ্যস্ত। অন্যদিকে গ্রামীণ বাংলায় নিস্তরঙ্গ নিরন্ন লোকসমাজে প্রাত্যহিক চর্চার মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যবাহী নাটকের আঙ্গিকগুলো নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখে। বাল্যে ও কৈশোরে নজরুল বর্ধমানের লোকজীবনে প্রচলিত এসব নাট্য আঙ্গিক প্রত্যক্ষ করে থাকবেন। তা ছাড়া ময়মনসিংহের ত্রিশালে বসবাসকালে ওই অঞ্চলে অদ্যাবধি প্রচল বাংলা নাটকের অন্যতম আঙ্গিক ঘাটু গানের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ঘটা স্বাভাবিক। ফলে বাংলা নাটকের আঙ্গিক সম্পর্কে নজরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থাকা খুবই সংগত। নজরুলের নাটক তাঁর মানস বৈশিষ্ট্যেরই শিল্পিত প্রকাশ। লেটো দলের ‘ব্যাঙাচি’ নজরুল পরবর্তীকালে বিচিত্র রাগরাগিণীর আশ্রয়ে গান রচনা করেছেন, সুর করেছেন, বেতারে ও আসরে গায়ক হিসেবে সংগীত পরিবেশনও করেছেন। সংগীতের প্রতি অত্যধিক মমত্ববোধ ও নাট্যানুরাগ তাঁকে গীতিনাট্য রচনায় অনুপ্রাণিত করে থাকবে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনার সঙ্গে তিনি নাটক রচনার প্রতিও ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী।

সমকালীন পেশাদার রঙ্গমঞ্চের নাটকের জন্য নজরুল অনেক গান রচনা করেন। তন্মধ্যে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’, মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাহাঙ্গীর’ ও ‘অন্নপূর্ণা, মন্মথ রায়ের ‘মহুয়া’ ও ‘লাইলী-মজনু’ উল্লেখ্য। কিন্তু সংলাপপ্রধান ইউরোপীয় পঞ্চাঙ্ক রীতির সেসব নাটক সম্ভবত তাঁর শিল্পীচৈতন্যের অনুকূল ছিল না। তাই দেখা যায়, তিন অঙ্কবিশিষ্ট ‘মধুমালা’ নাটক রচনা করতে বসে তিনি কোনোরূপ দৃশ্য বিভাজন করেননি। এ নাটকে দৃশ্যান্তর আছে কিন্তু ইউরোপীয় পঞ্চাঙ্ক বা তিন অঙ্কের নাটকের মতো আখ্যান বিভাজক দৃশ্য বিভাজন রীতি অনুসৃত হয়নি। এতে যতবার অঙ্ক কথাটি ব্যবহৃত হোক না কেন, পঁয়তাল্লিশটি গান-সংবলিত এ নাটককে কোনো যুক্তিতেই ইউরোপীয় রীতির নাটক বলা যায় না। বরং নাটকের অন্তর্কাঠামোতে প্রবহমান কাহিনি কথনের প্রবণতাটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের কথা, সংলাপ, সংগীত, বাদ্য সহযোগে তিনি আখ্যান প্রধান নাটক রচনা করেন।  এ থেকে অনুমিত হয়, সচেতনভাবেই তিনি ইউরোপীয় নাট্য আঙ্গিক পরিহার করেন। নজরুলের ক্ষুদ্রায়তন নাটকের সংখ্যা বিশেষজ্ঞের বিবেচনায় প্রায় একশ, তুলনায় পূর্ণাঙ্গ নাটক সংখ্যায় অল্প। উল্লেখযোগ্য নাটক– আলেয়া (গীতিনাট্য), ঝিলিমিলি (নাটিকা), মধুমালা (গীতিনাট্য), সেতুবন্ধ, বিদ্যাপতি (পালা-নাটিকা) ইত্যাদি। সংগীতপ্রধান এসব নাটক ঐতিহ্যবাহী বাংলানাট্যের নিকটাত্মীয়। এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান বাঙালির নাট্য আঙ্গিকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। আমাদের আলোচ্য ‘বিদ্যাপতি’ (পালা-নাটিকা)-র  আলোচনায় বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া বাঞ্ছনীয়।  

১৯৩৫-১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নজরুল ইসলাম ‘বিদ্যাপতি’ (পালা-নাটিকা) রচনা করেন। পনেরো শতকের মৈথিলি কবি বিদ্যাপতির সঙ্গে মিথিলার রাজা শিব সিংহের স্ত্রী লছমীর প্রেমের আখ্যান নিয়ে আলোচ্য পালার বিস্তার ও পরিসমাপ্তি। দেবী দুর্গা, দেবী গঙ্গা, কবি বিদ্যাপতি, রাজা শিব সিংহ, রানী লছমী, বিষ্ণু উপাসিকা অনুরাধা, বিদ্যাপতির কনিষ্ঠা ভগ্নী বিজয়া, রাজার বয়স্য ধনঞ্জয় এই আটটি চরিত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরে নিহিত নাট্যবস্তু। রাজা শিব সিংহের সভাকবি ও প্রধানমন্ত্রী বিদ্যাপতি, প্রত্যহ নতুন নতুন কবিতা ও গান রচনা করে রাজাকে উপহার দেন। রাজকার্য পরিচালনা করেন। রানী লছমী কবি বিদ্যাপতির গানের সুর ও কথায় মুগ্ধ, ভালোবাসেন কবিকে। অনুরাধা কৃষ্ণভক্ত, সে বিজয়ার বান্ধবী হিসেবে বিদ্যাপতির আশ্রিতা। সে বিদ্যাপতিরও অনুরাগিণী। দুর্গাভক্ত বিদ্যাপতি দেবী দুর্গার নির্দেশে কৃষ্ণভক্তে পরিণত হন। রাজা শিব সিংহ ধনঞ্জয়ের মাধ্যমে অবগত হন, বিদ্যাপতির কাব্যসাধনা, সংগীত সাধনার প্রধান শক্তি হচ্ছে রানী লছমী। গোপন পরীক্ষার দ্বারা রাজা সত্য উদ্ঘাটন করেন। বিদ্যাপতি ও রানীর সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধি করার পর শিব সিংহের আকস্মিক মৃত্যু হয়। এক বছর পর রানী লছমী বিদ্যাপতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। বিদ্যাপতি গঙ্গায় ঝাঁপ দেন, সঙ্গে রানীও।

গহন অন্ধকার সে রাতে তাদের মিলন ঘটিয়ে অনুরাধাও গঙ্গার স্রোতে ভেসে যায়। এই আখ্যান বিন্যাসে কাজী নজরুল ইসলাম ছোট রড় অনেক গান ব্যবহার করেছেন। বিদ্যপাতি রচিত পদ এবং নিজের রচিত গানের সাহায্যে আখ্যান বিন্যস্ত করেছেন। এ পালায় ব্যবহৃত সংলাপ, সংলাপ পরম্পরায় রচিত ইউরোপীয় আঙ্গিকের নাটকের মতো উক্তি মাত্র নয়। যেমন– লছমীর সংলাপ। লছমী: হ্যাঁ একা। আর থাকতে পারলাম না বলেই তো আমার দুঃখের দোসরের অভিসারে বেরিয়েছি। বিদ্যাপতি। চার বছর ধরে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজ তোমার কাছে পরাজয় স্বীকার করতে এলাম। রাজা যেদিন আমাদের সকল প্রেমকে ম্লান করে চলে গেলেন, সেইদিন থেকেই এই এক বছর তোমায় ভুলতে চেয়েছি, তোমার প্রেম– তোমার গান– তোমার সকল কিছুকে উপেক্ষা করতে অবহেলা করতে চেয়েছি। যত ভুলতে চেয়েছি, তুমি হয়েছ তত নিকটতম। এ কী দুর্বার আকর্ষণ তোমার! আমি ক্ষতবিক্ষত হলাম নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে করে, আর পারিনে।

আমায় ঠাঁই দাও ওই চরণে। সংলাপ এখানে চরিত্রের আত্মার কথনও। সংলাপের পরিপূরক সংগীত কখনও সংগীতাংশ। এতক্ষণকার আলোচনার প্রেক্ষাপটে যৌক্তিকভাবেই বলা যায়, আসরে আসরে পরিবেশিত লেটো, ঘাটু, টুসু, ভাদু, মঙ্গলনাট্য, লীলা, পদাবলি কীর্তন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা বর্ধমান ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বসবাসের সূত্রে নজরুলের চেতনায় ছিল বদ্ধমূল। লজরুল ঐতিহ্যবাহী পালার আঙ্গিকে ‘বিদ্যাপতি’ পালা রচনা করেন। মোট ১৩ খণ্ডে পরিসমাপ্ত আখ্যানে কথকতার ঢঙে রচিত সংলাপ, সংগীতের মাধ্যমে আখ্যান বিবৃত হয়েছে। দেবী দুর্গা, দেবী গঙ্গা, কবি বিদ্যাপতি, শিব সিংহ (মিথিলার রাজা), লছমী (মিথিলার রানী), অনুরাধা (বিষ্ণু-উপাসিকা), বিজয়া (বিদ্যাপতির কনিষ্ঠা ভগ্নী), ধনঞ্জয় (রাজ-বয়স্য) এই আটটি চরিত্রের জাগতিক প্রেম নিষ্কাম আধ্যাত্মিক প্রেমে রূপান্তরের আখ্যান বিদ্যাপতি পালা। এ পালায় আংশিক, পূর্ণাঙ্গ সব মিলিয়ে মোট ২৪টি সংগীত ব্যবহৃত হয়েছে। পালার নিয়মানুসারে সংগীত আখ্যানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশুদ্ধ সংগীত হিসেবে চরিত্রের সংলাপ, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বর্ণনা করতে সংগীত প্রয়োগ করা হয়েছে। মধ্যযুগীয় পালায় আখ্যান গড়ন এ রকমই। নজরুল ঐতিহ্যবাহী পালার কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে তাঁর ‘বিদ্যাপতি’ (পালা-নাটিকা) রচনা করেছেন। 
 

ঢাকানিউজ২৪.কম / এইচ

আরো পড়ুন

banner image
banner image