• ঢাকা
  • সোমবার, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ; ১৫ জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image
website logo

একজন বিপ্লবীর উত্থান ও অকালমৃত্যু


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: রবিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:৪৯ পিএম
ফরহাদ
বক্তব্য রাখছেন কমরেড ফরহাদ

এম এম আকাশ

৬০ দশকের বিপ্লবী নক্ষত্রপুঞ্জের কেন্দ্রীয় সবচেয়ে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রটি ছিলেন নিঃসন্দেহে মো. ফরহাদ কমরেড ফরহাদের জন্ম হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। সুতরাং আমার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কোনো সুযোগ ছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই লেখা কিছুটা দূর থেকে দেখা ও কিছুটা প্রশস্তিমূলক। তাঁকে আমি দেখেছি একজন অত্যন্ত সম্মানিত পার্টিনেতা হিসেবে।

পার্টির এক প্রান্তে ছিলেন ১৯৩০ ও ৪০ দশকের সর্বত্যাগী বৃদ্ধ কমিউনিস্ট দাদারা—জ্ঞান চক্রবর্তী, অনিল মুখার্জি, জিতেন ঘোষ, খোকা রায়, মণি সিংহ, হেনাদি, অনিমাদি প্রমুখ নেতা। আরেক প্রান্তে ছিলেন ৬০ দশকের আন্দোলনের তরঙ্গশীর্ষের তরুণ-তরুণীরা—সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, মতিউর রহমান, মালেকা বেগম, সর্বকনিষ্ঠ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ নেতা। তাঁরা ছিলেন প্রবহমান ৬০ দশকের স্টোনমিং হেভেনস বা স্বর্গের ঝটিকাবাহিনী। আর এই ৬০ দশকের বিপ্লবী নক্ষত্রপুঞ্জের কেন্দ্রীয় সবচেয়ে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রটি ছিলেন নিঃসন্দেহে মো. ফরহাদ। জ্বলজ্বলে এই অর্থে নয় যে তিনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন ‘কেরেসমেটিক’ ব্যক্তিত্ব।

না, তা তিনি ছিলেন না, কিন্তু তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় সংগঠকের স্থানটি দখল করে ছিলেন, তা আর কারও পক্ষে দখল করা সম্ভব হয়নি। তিনি ছিলেন আমাদের সর্বত্যাগী প্রবীণ কমিউনিস্ট প্রজন্ম এবং পরবর্তী নবীন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের মধ্যে অন্যতম এক ‘সেতুবন্ধ’। কঠিন জীবন পাকিস্তানের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কমিউনিস্টদের অধিকাংশ সময় থাকতে হয়েছে ‘আন্ডার গ্রাউন্ডে’।

কমিউনিস্ট মানেই তখন ছিল ‘আত্মত্যাগ’, জেল-জুলুম-নির্যাতন ও আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ।। কমিউনিস্ট রাজনীতিতে যাঁরাই তখন দীক্ষা নিয়েছেন, তাঁদের জীবনটা সুখের এবং নিরাপদ ছিল না। ১৯৫২ সালে কমরেড ফরহাদের বয়স যখন মাত্র ১৬ বছর এবং তিনি যখন মাত্র নবম শ্রেণির ছাত্র, তখনই তার রাজনৈতিক চেতনার সূচনা। এ বিষয়ে তাঁর নিজের স্মৃতিচারণা: ‘লেনিনের বই পড়েছিলাম “কি করিতে হইবে”, নবম শ্রেণীর ছাত্র অবস্থায়।...মোদ্দাকথায় অবশ্য একটা কথা বুঝেছিলাম যে ধনী আর দরিদ্র, শোষক আর শোষিত–এই হল মূল দ্বন্দ্ব। আর শোষণমুক্ত সমাজের নাম হলো “সমাজতন্ত্র”।

সমাজতান্ত্রিক মানুষের জীবনের সুখ আর আনন্দের ছবি দেখেছিলাম অনেক বইয়ে, পত্রপত্রিকায়। বিলাত আমেরিকার মানুষের জীবনের ছবিও দেখেছিলাম। সেগুলোও সুন্দর। কিন্তু মন বলতো, সেসব দেশে শান্তি নাই, মানুষের উপর শোষণ আছে সেসব দেশে। কাজেই অল্প বয়সে ভক্ত হয়ে গেলাম সমাজতন্ত্রের। আমার স্কুলের খাতায় আঁকতাম কাস্তে-হাতুড়ির ছবি।’ [মোহাম্মদ ফরহাদ, ‘স্মৃতি থেকে’, মোহাম্মদ ফরহাদ নিবেদিত রচনাগুচ্ছ, ১৯৮৮, পৃ. ১১৩]।

ছোটবেলাতে জেলে যাওয়ার আগেই জেলে যাওয়ার রিহার্সাল শুরু করেছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ। মোহাম্মদ ফরহাদ: জীবন ও সংগ্রাম গ্রন্থে গবেষক নিতাই দাস লিখেছেন—‘মো. ফরহাদ শুনেছিলেন যে জেলে গেলে খালি মেঝেতে ঘুমাতে হয় এবং বিছানা-মশারী কিছুই দেওয়া হয় না। ওই কষ্টের জীবনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য তিনিও তক্তপোষ থেকে বিছানা-মশারি গুটিয়ে নেন। এভাবে খালি তক্তপোষে মশার দংশন সহ্য করে তাঁর অনেক রজনী অতিবাহিত হয়েছিল। একদিন অবশ্য তিনি এই অবস্থায় বাবার কাছে ধরা পড়ে যান।’ ষাট দশকের নক্ষত্র মো. ফরহাদ ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পর ছাত্র রাজনীতি প্রথমে কিছুদিন স্তিমিত অবস্থায় থেকে আবার ধীরে ধীরে নানারকম ছদ্মনামের আড়ালে কর্মতৎপর হয়। সে সময় ‘অগ্রগামী’, ‘যাত্রিক’, ‘অগ্রদূত’, ‘প্রগতি’ প্রভৃতি নামের আড়ালে ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রলীগসহ প্রভৃতি সংগঠনের কর্মীরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধীরে ধীরে কাজ শুরু করেন। সে সময় ছাত্রদের মধ্যে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসংখ্যা ছিল খুবই কম। মোহাম্মদ ফরহাদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৫৫ সালেই পার্টির সদস্যপদ লাভ করেছিলেন।

১৯৫৯ সালের শেষ দিকে ঢাকায় গঠিত হয় মাত্র তিনজন ছাত্র সদস্যকে নিয়ে পার্টির ছাত্র শাখা। এই তিনজন সদস্য ছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ, আব্দুল হালিম এবং আহমেদ জামান। ছাত্রজীবন শেষে আব্দুল হালিম শিক্ষকতায় এবং আহমেদ জামান ডাক্তারি শিক্ষায় নিয়োজিত হন। মো. ফরহাদ ১৯৬২ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত থেকে যান পার্টি ও ছাত্র আন্দোলনের গোপন যোগসূত্র হিসেবে। এই সমগ্র সময়টাই তাঁকে আত্মগোপনে থেকে পার্টির পক্ষ থেকে ছাত্র আন্দোলনকে দিকনির্দেশনা দিতে হয়েছিল।

সে সময়কার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রয়াত সাংবাদিক বজলুর রহমান লিখেছেন, “‘যে পারে সে এমনি পারে, পারে সে ফুল ফুটাতে।’’ মোহাম্মদ ফরহাদ ছিলেন অনেকটা তেমনি। হালকা-পাতলা ছোটখাটো গড়নের মানুষটি। বন্ধুরা “টেক” নাম দিয়েছিল “ছোটলোক” বা “লিটলম্যান”। অনলবর্ষী বক্তাও ছিলেন না তিনি, ছাত্ররাজনীতিতে জনপ্রিয়তার যা একটা বড় উপাদান। তবু তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। সবার নেতা। সবাই জানতো ছাত্র ইউনিয়নের মূল নেতা তিনিই, তাঁর কথাই শেষ কথা।’ [বজলুর রহমান, ‘প্রথম দেখা শেষ দেখা’, মোহাম্মদ ফরহাদ নিবেদিত রচনাগুচ্ছ, জ্ঞান প্রকাশনী, মে, ১৯৮৮, পৃ. ৩০]।

তাঁর অন্যতম সহযাত্রী কমরেড মতিউর রহমান তাঁর মৃত্যুর পর লিখেছেন, ‘ষাটের দশকের ছাত্র-গণ-আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে এগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনায় সরাসরি তদারকি করা, দিনরাত নিয়মিত খোঁজখবর রাখার জন্য কমরেড ফরহাদ বহু সময়েই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সি-ফাইড, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আহসানউল্লাহ হলের ৩২১ ও নজরুল ইসলাম হলের ৪১ নম্বর রুম এবং উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে মহসিন হলের একটি কক্ষে থেকেছেন।

সাহসের সাথে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে কাজ করার ফলেই সে সময়গুলিতে আন্দোলনের উপর পার্টি প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল।...এভাবেই দশকের পর দশক ধরে তিনি অব্যাহতভাবে গড়ে তুলেছিলেন পার্টিকে একটু একটু করে। এসব কিছুর সাথে সাথে অস্বাভাবিক রকমের শক্ত ধাতের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়কালে অস্বস্তি ও অসুস্থতায় ভুগতে শুরু করলেন। আর তাই, “বিপ্লবের জন্য আরো পাঁচটি বছর কাজ করে যাওয়ার” অদম্য ইচ্ছেও তাঁর পূরণ হলো না। এ দুঃখ আমরা রাখবো

লেখক, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকানিউজ২৪.কম / এসডি

আরো পড়ুন

banner image
banner image