• ঢাকা
  • রবিবার, ২২ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ০৫ ফেরুয়ারী, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

নারীশিক্ষায় আফগানিস্তানে নিষেধাজ্ঞা আত্মঘাতী


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: রবিবার, ০৮ জানুয়ারী, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ১১:৩৬ এএম
আত্মঘাতী
নারীশিক্ষায় আফগানিস্তানে নিষেধাজ্ঞা

নিউজ ডেস্ক : আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় এসেই নারীদের ওপর একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করে তালেবান কর্তৃপক্ষ। ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারীরা। এ সবের মধ্যদিয়ে কেড়ে নেয়া হয় তাদের পোশাক পরা এবং চাকরির অধিকারসহ নানা অধিকার। সবশেষ কেড়ে নেয়া হলো শিক্ষার অধিকারও, যা আফগান নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত বলে মনে করা হচ্ছে।

আফগানিস্তানে নারীশিক্ষায় তালেবান কর্তৃপক্ষের এ নিষেধাজ্ঞা দেয়ার সিদ্ধান্তকে দেশটির বিশ্লেষকদের অনেকেই আত্মঘাতী বলে মনে করছেন। 

তারা বলছেন, আফগান নারীদের শিক্ষাবঞ্চিত করার বিষয়টি কারও জন্যই লাভবান হবে না। বরং এর জন্য শাসক ও শাসিত উভয়কেই এর চরম মূল্য চুকাতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নারীশিক্ষা নিষিদ্ধ করে তালেবান যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা ইসলাম ধর্মের মূল শিক্ষাবিরোধী। এর ফলে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আফগান সমাজ।

প্রথম দফায় ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল তালেবান। তখন দেশটির নারীরা পড়ালেখা করতে পারতেন না, পারতেন না চাকরি করতে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হামলায় ২০০১ সালে তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল। এতে দেশটির নারীরা শিক্ষা ও চাকরির অধিকার ফিরে পেয়েছিল।

প্রায় ২০ বছর পর ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়। বিদেশি সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়ার মধ্যেই তালেবানের অভিযানে পশ্চিমা-সমর্থিত আফগান সরকারের পতন হয়। তালেবান দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরে আসে।

তালেবান ক্ষমতায় ফিরেই আফগানিস্তানে ইসলামভিত্তিক শরিয়া আইন চালু করে। তবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা এবার আর আগেরবারের মতো কট্টর পন্থায় দেশ শাসন করবে না। সেই সঙ্গে তারা নারী অধিকারকে সম্মান দেখানোর অঙ্গীকার করে। কিন্তু কিছুদিন পরই দেশের বেশিরভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেয়ে শিক্ষার্থীদের বাদ দেয়া হয়। আফগান নারী শিক্ষার্থীদের মনে আশঙ্কা দানা বাঁধে, নারীশিক্ষা নিষিদ্ধ করতে পারে তালেবান।

অবশেষে এক বছরের কিছু বেশি সময় পর গত বছরের (২০২২) শেষ দিকে (২০ ডিসেম্বর) আদেশটি আসে। আফগানিস্তানে নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তালেবান। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়।
 
পরদিন হিজাব পরা আফগান নারী শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যান। কিন্তু তালেবান প্রহরীরা ফটকেই আটকে দিয়ে তাদের ফিরিয়ে দেন। হতাশ নারী শিক্ষার্থীরা ফটকের বাইরেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেন।

সময়ের প্রয়োজনে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে কট্টর দেশ সৌদি আরবের তরুণ শাসক মোহাম্মাদ বিন সালমান তার দেশকে ধর্মান্ধতা ও রক্ষণশীলতা থেকে বের করে আনতে বিভিন্ন সংস্কার করছেন। নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দিতে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া, ছবি দেখা, রাস্তায় একাকী চলার স্বাধীনতা, চুল ছোট করতে পারা, পার্টি-ফাংশন-কনসার্ট করা, পাসপোর্ট করা, সিনেমা হল উন্মুক্ত করাসহ নানা অধিকার দিচ্ছেন। বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করতে নানা কর্মসূচি নিচ্ছেন।

সৌদি আরবের মতো কট্টর ইসলামি দেশ যখন সংস্কার-পরিবর্তনের দিকে হাঁটছে; ইরানে যখন সংস্কারের পক্ষে অভাবনীয় সংগ্রাম চলছে; ঠিক তখন আফগানিস্তানের তালেবান শাসক নারীশিক্ষায় নিষেধাজ্ঞার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগান নারীদের উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে শুধু নারীদের ওপরই প্রভাব পড়েনি, দেশটিতে সামাজিক অগ্রসরতার ক্ষেত্রে সামান্য যে আশার প্রদীপ মিট মিট করে জ্বলছিল, তা-ও নিভে গেল। তালেবানের এ নিষেধাজ্ঞা সরাসরি ইসলামের শিক্ষাবিরোধী। ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর জ্ঞানার্জন ফরজ। অর্থাৎ নারী-পুরুষ উভয়ের নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত যেমন অবশ্যই কর্তব্য, ঠিক একইভাবে মৌলিক বিষয়ে জ্ঞানার্জন করাও কর্তব্য।

আধুনিক বিশ্বে অধিকাংশ মুসলমান নানাবিধ ব্যাখ্যার বদৌলতে ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের সমন্বয় করে চলার চেষ্টা করলেও তালেবানে সেই পথে যায়নি।

আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষাবিষয়ক মন্ত্রী নিদা মোহাম্মদ নাদিম নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ করে দেয়ার পেছনে কয়েকটি যুক্তি দিয়েছেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মেয়েদের আলাদা রাখার মতো প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতিকেও অন্যতম যুক্তি হিসেবে হাজির করেছেন তিনি।

তালেবান মন্ত্রীর দাবি, মেয়েরা যখন শ্রেণিকক্ষে যাচ্ছে, তখন তালেবান যে ড্রেস কোড নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, তা তারা মানছেন না। এর আগে গত মার্চ মাসে যখন মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়তে আসা বন্ধ করেছিল, সে সময়েও একই যুক্তি দেখিয়েছিলেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মেয়েদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার এ সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাতও রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি আদায় তালেবানদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ল। আবার যেসব রাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে আফগানিস্তানের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কাজ চলছে, সেটিও বাধাগ্রস্ত হবে। শিক্ষাবিরোধী এ আদেশ আফগানিস্তানের জনগণ, এমনকি তালেবান নেতাদের পূর্ণ সমর্থন পায়নি।

তালেবানের এ নীতির কারণে যারা সরাসরি আক্রান্ত হলেন, তারাই শুধু সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন না, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কর্মরত অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কেননা, জনগণ যেসব প্রশ্নের উত্তর ও সমাধান খুঁজছে, তা তারা দিতে পারছেন না।

নারীশিক্ষা নিষিদ্ধ করার কয়েকদিন পরই আফগান নারীদের দেশি-বিদেশি এনজিওতে কাজ করার বিরুদ্ধেও নেমে আসে নিষেধাজ্ঞার খড়্গ। ২৪ ডিসেম্বর তালেবান কর্তৃপক্ষ জানায়, নির্ধারিত ইসলামি ড্রেস কোড মেনে না চলার কারণে এখন থেকে দেশি এবং বিদেশি এনজিওতে আফগান নারীরা আর কাজ করতে পারবেন না।

দেশটিতে সক্রিয় এনজিওগুলোকে আদেশ দেয়া হয়েছে যেন সংস্থাগুলোর নারী কর্মীদের কাজে যোগদান বন্ধ করা হয়। এ আদেশ পালন না করলে এনজিওগুলোর লাইসেন্স বাতিলের হুমকিও দেয়া হয়েছে।

জাতিসংঘ তালেবানের জারি করা নির্দেশকে মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল, সেভ দ্য চিলড্রেন ও নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের (এনআরসি) মতো আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো দেশটিতে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে।

এনজিওগুলো এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, নারীদের ছাড়া তাদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। আফগান নারী ও পুরুষ উভয়েই যেন সমানভাবে এনজিওগুলোর জীবন রক্ষাকারী সহায়তা সেবা চালিয়ে যেতে পারে সেই প্রত্যাশাই করছে তারা।

ঢাকানিউজ২৪.কম / কেএন

আর্ন্তজাতিক বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image