• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৯ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ০২ ফেরুয়ারী, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

মোবাশ্বের হোসেন: নাগরিক অধিকার আদায়ে স্পষ্টভাষী


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ০৫ জানুয়ারী, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ০১:৫১ পিএম
নাগরিক অধিকার আদায়ে স্পষ্টভাষী
স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন

ড. আকতার মাহমুদ

নানা কাজের ধরনের কারণে স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন ছিলেন বহু পরিচয়ে পরিচিত। তিনি স্থাপত্য পেশার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ছিলেন একজন নগরচিন্তক, কখনোবা নাগরিক অধিকার আদায়ে অ্যাক্টিভিস্ট। নগরীর নানা অসংগতির কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। নগরে গণপরিসর, গণপরিষেবা, গণপরিবহন, নাগরিক অধিকার, যানজট, নগর-পরিবেশসহ সমাজের নানা সমস্যা নিয়ে গণমাধ্যমে তিনি সরব ছিলেন সবসময়। পরিষ্কার করে বলতেন তিনি কোন দলের সমর্থক; কিন্তু তিনি তার দলের সমালোচনা করতেও কোনো দিন কার্পণ্য দেখাননি।

তিনি যেখানেই কাজ করেছেন সেখানেই ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পেশাজীবী স্থপতি হিসেবে, পরিবেশবাদী হিসেবে, নগর আন্দোলনে অথবা ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে নেতৃত্বের জায়গা থেকে তিনি সবাইকে নিয়ে কাজ করার উদারতা দেখিয়েছেন। দেশ ও সমাজে ভালো কিছু করার আগ্রহ ও প্রত্যয় ছিল তার সবসময়। ভালোবেসে আমরা তাকে মোবাশ্বের ভাই বলে সম্বোধন করতাম।

পেশাজীবী হিসেবে তিনি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি ছিলেন। স্থপতিদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, পেশাজীবীদের সংগঠিত এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এছাড়া তিনি স্থপতিদের এশিয়া অঞ্চলের সংগঠন ‘আর্কেশিয়া’ এবং কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশান অব আর্কিটেক্টসের নির্বাচিত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।  

মোবাশ্বের ভাই নাগরিক ও সামাজিক আন্দোলনের অগ্রগামী ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সহসভাপতি ছিলেন এবং ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক ছিলেন। ব্রাদার্স ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং সম্মিলিত ক্রীড়া পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক।

যেই পরিচয়ে তার সব পরিচয়কে ছাপিয়ে যায়, সেটি হলো তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। সম্ভবত সে কারণে তিনি সাহসী এবং অকুতোভয়। রাষ্ট্র, সংগঠন এমনকি ব্যক্তির অধিকার সমুন্নত রাখতে স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন আমৃত্যু সচেষ্ট ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশকে স্বাধীন করার পর থেকে দেশ গড়ার কাজেও সর্বদা নিয়োজিত থেকেছেন। পরিবেশ রক্ষা এবং নগরীকে বাসযোগ্য করার আন্দোলনে যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন ভূমিকা রেখেছেন।

নাগরিক অধিকার আন্দোলন

শহরের খেলার মাঠ দখলমুক্ত করে মহল্লার ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি, নদী-খাল-জলাশয় সংরক্ষণ, সবুজায়ন, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, নগরীর পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি দীর্ঘ অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে যুক্ত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার এ আন্দোলনে আরো অনেককেই পাশে পেয়েছেন। বিষয় বিবেচনায় স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ, পরিবেশবাদী, আইনজীবী, সাধারণ মানুষ সেসব আন্দোলনে শামিল হয়েছেন।   

২০১১ সালে ধানমন্ডির একটি মাঠ রক্ষার আন্দোলন চলছিল। সে সময় আমি ‘বাংলাদেশে অ্যাক্টিভিজম ও সিভিল সোসাইটি মুভমেন্টের অবস্থা ও ভবিষ্যৎ’ নিয়ে একটা গবেষণাকাজ করছিলাম। আমার কাজের অংশ হিসেবে তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মোবাশ্বের ভাই, আপনার কি মনে হচ্ছে না আমাদের দেশে সিভিল সোসাইটি আন্দোলনের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘দেখো আকতার, গত শতাব্দীর শেষ দশক এমনকি এ শতাব্দীর প্রথম দশকেও সিভিল সোসাইটি মুভমেন্ট ও অ্যাক্টিভিজমের যে চর্চা এ শহরে ছিল, ইদানীং সে চর্চায় কিছুটা স্থবিরতা ও সীমাবদ্ধতা দেখতে পাচ্ছি।’

খেলার মাঠ ও নদী দখল প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজের নেগেটিভ ফোর্সগুলো সবসময় চেষ্টা করবে তাদের অর্থ, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নগরীর জনগণের সম্পত্তি (পাবলিক প্রোপার্টি) দখল করতে কিন্তু সিভিল সোসাইটির কাজ হলো নিজেদের মধ্যে সংযুক্তি বাড়ানো, সামষ্টিক স্বার্থে সামাজিক আন্দোলনের সব মাধ্যমে তার প্রতিবাদ করা এবং জনগণের কাছে সেটি যৌক্তিকভাবে তুলে ধরা।’

নগরীর নাগরিক অধিকার, নাগরিক পরিষেবা, মানসম্পন্ন গণপরিবহন ব্যবস্থার দাবিতে তিনি সর্বদা স্পষ্ট কথা বলেছেন। জনস্বার্থে কখনো তিনি আইনি লড়াই করেছেন আবার কখনো বা জনস্বার্থে আন্দোলন করতে গিয়ে মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য শহর বিনির্মাণে মামলার ভয়কে তিনি তোয়াক্কা করেননি।

নাগরিক অধিকার আন্দোলনে তার আরেক সহযোদ্ধা স্থপতি ইকবাল হাবিব তার সম্পর্কে বলেছেন, নাগরিক আন্দোলনের সব ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি ‘স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার’ ওপর আস্থা রেখে জনস্বার্থে মামলা করার মাধ্যমে অধিকার আদায়ের পথে হেঁটেছেন নিরন্তর। সে সঙ্গে জনগণের সামনে বিষয়গুলো উপস্থাপনের মধ্য দিয়েও জনসচেতনতায় সচেষ্ট থেকেছেন।

নতুনদের সুযোগ করে দেয়া

নগর বিষয়ে কে কী কাজ করছে, শুধু যে তার খোঁজখবর রেখেছেন তা নয়, চেষ্টা করেছেন তাকে নানাভাবে উৎসাহ দিতে। কাজের ফলকে সবার সামনে তুলে ধরতে। নিজের ডিসিপ্লিনের বাইরেও নগর পরিকল্পনা, প্রকৌশলবিদ্যা কিংবা নগর পরিবেশ নিয়ে যখনই কেউ কোনো নতুন কাজ করছে, সেটা বড় প্লাটফর্মে তুলে ধরার সুযোগ করে দিতে কার্পণ্য করেননি। তার সঙ্গে অনেকদিন ধরে কাজ করার সময় দেখেছি সভা, সেমিনার কিংবা টিভিতে নতুন গবেষককে তিনি সুযোগ করে দিয়ে উৎসাহ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের মারুফ হোসেন তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলছিলেন, ‘না জানিয়েই অনেক জায়গায় আমাকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছেন, এটা ছিল তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আমন্ত্রণকারীরা আমাকে কীভাবে খুঁজে পেলেন জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে বলতেন, মোবাশ্বের স্যার আপনার কথা বলেছে।’ 

আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা

তিনি যুক্ত ছিলেন নতুন প্রজন্মের গঠনমূলক কাজের সঙ্গেও। তরুণ প্রজন্মের মাঠ-পার্ক সুরক্ষা, নগরীর সবুজায়ন, ছাদকৃষি, অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কাজে সঙ্গে থেকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। দেশ পরিচালনায় যে প্রজন্ম আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে, তাদের ভালো কাজে উৎসাহ দিয়েছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা তাদের সঙ্গে থেকে দেশকে ভালোবাসার কাজে অনুপ্রাণিত করেছেন। 

যেখানে তার অভাব অনুভব করব

তিনি আমাদের নানাভাবে ঋণী করে গেছেন। আমরা তার অভাব অনুভব করব নানাভাবে, নানা পরিস্থিতিতে। সাংবাদিক ও লেখক আমিন আল রশিদ তার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে এভাবে, ‘কাউকে পাত্তা না দিয়ে কথা বলার মানুষ আমাদের সমাজে খুবই কম। সেই খুবই কমদের একজন ছিলেন মোবাশ্বের হোসেন। আমরা তাকে মিস করব। আমরা তাকে মিস করব আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি ও খেলার মাঠ রক্ষার লড়াইয়ে। আমরা তাকে মিস করব ক্ষমতাবান লোকের মুখের উপরে যখন যে কথাটি বলা দরকার, সেটি নিঃসংকোচে বলার প্রয়োজন হলে।’

কয়েক বছর ধরে তার মাঝে কিছু শারীরিক জটিলতা থাকলেও যেকোনো অনুষ্ঠানে, সভা, সেমিনারে তাকে মানসিকভাবে কখনোই ক্লান্ত লাগেনি। স্বভাবসুলভ তার ধারালো যুক্তি দিয়ে স্পষ্ট কথা বলেছেন। 

ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা

ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমাকে পছন্দ করতেন বলে জানতাম। নানা সময়ে নানা কাজে একসঙ্গে কাজ করেছি। তিনি আগ্রহ করে সহযোগিতা করেছেন। আমি যখন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলাম তখনো পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিদের দুটি সংগঠন অনেক কাজ একসঙ্গে করার সুযোগ হয়েছিল। তখনো মূলে ছিল তার আন্তরিক সহযোগিতা। আমি এখনো বিশ্বাস করি, নগরীর সামষ্টিক স্বার্থে পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও প্রকৌশলী তিনটি পেশাজীবীদের একসঙ্গে কাজ করা দরকার।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্টেনগান কাঁধে মোবাশ্বের ভাইয়ের একটা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে হয়তো অনেকেই দেখেছেন। এ ছবিটি নিয়ে তিনি তার এক সাক্ষাৎকারে অদ্ভুত একটা কথা বললেন, ‘আমার নিজের এ ছবিটা সবসময় আমার টেবিলের পাশে রাখি। অনেকে বলেন, এ ছবি কেন এখানে রাখেন! আমি এ ছবি এখানে রাখি তার একটি মাত্র কারণ, আমার যেন পদস্খলন না হয়, প্রতিক্ষণে এ ছবিটা যেন আমাকে পাহারা দেয়।’

যুগে যুগে শহরের পজিটিভ পরিবর্তনের জন্য অনেক আর্কিটেক্ট অ্যাক্টিভিস্টের ভূমিকায়ও কাজ করেছেন। মোবাশ্বের ভাই তাদের একজন হয়ে থাকবেন। আপনি সর্বজনশ্রদ্ধেয় হয়ে সবার অন্তরে অবস্থান করবেন এ বিশ্বাস রাখি।

ড. আকতার মাহমুদ: নগর পরিকল্পনাবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি

ঢাকানিউজ২৪.কম /

স্মরণীয় ও বরণীয় বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image