• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ; ২৩ মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image
website logo

সর্বজনীন পেনশন স্কিম: কার্যকর করব কীভাবে


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ আগষ্ট, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ১১:৪৭ এএম
কার্যকর করব কীভাবে
সর্বজনীন পেনশন স্কিম

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের উদ্দেশ্য যে মহৎ– তাতে আমার সন্দেহ নেই। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সময়ে সম্ভবত ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মাহবুব আহমেদ অর্থ সচিব থাকাকালে এ ব্যাপারে অর্থ বিভাগ কিছুটা কাজও শুরু করে। মাঝখানে ধীর লয়ে এগোলেও বর্তমান অর্থ সচিবের সময়ে তা গতি পায়। সে কারণে অর্থ বিভাগ, অর্থমন্ত্রী ও সরকারপ্রধানকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয় সংক্ষিপ্তাকারে হলেও গত বৃহস্পতিবার দেশে প্রথম সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করার জন্য।

জানা গেল, দেশের চার শ্রেণির প্রায় ১০ কোটি মানুষকে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা বিবেচনায় নিয়েই এ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। শুরুতে এই পেনশন ব্যবস্থায় রয়েছে চারটি আলাদা স্কিম। সেগুলো হচ্ছে– প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা। এর মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রবাস; বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের জন্য প্রগতি; রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে ও তাঁতি ইত্যাদি স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য সুরক্ষা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সমতা স্কিম নেওয়া হয়েছে। তবে কোনো চাঁদাদাতা যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে স্কিম পরিবর্তন করতে পারবেন।

অন্য যে দুটি স্কিম পরে চালু করা হবে বলে জানা গেছে, তার মধ্যে একটি শ্রমিক শ্রেণির জন্য, অন্যটি শিক্ষার্থী। তবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের কথা বললে বলা যায়, ২০৩৫ বা ২০৪১ সাল থেকে সরকারি কর্মচারী এবং স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্যও সর্বজনীন পেনশন স্কিম উন্মুক্ত করা হবে। এই স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর বয়স ৬০ বছর হলেই আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন একজন চাঁদাদাতা। তবে চাঁদাদাতা মারা গেলে তাঁর নমিনি বা মনোনীত উত্তরাধিকারী পেনশন পাবেন। এ ক্ষেত্রে চাঁদাদাতার ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত হতে যত বছর বাকি থাকবে, সে সময় পর্যন্ত নমিনি পেনশন উত্তোলন করতে পারবেন।

পেশাগত জীবনের সমাপ্তিতে পেনশনপ্রাপ্তি আর্থিক নিরাপত্তার অবলম্বন হিসেবে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবীরা এ সুবিধা পেলেও যারা বেসরকারি চাকরি করেন, তারা এমন ‍সুবিধা পান না। এ ছাড়া যারা স্বল্প আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তারাও কর্মজীবন শেষে আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এর ফলে যে সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়, তা নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে যে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে এটি অনন্য দৃষ্টান্ত হবে।

এরই মধ্যে সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা জারি করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ‘ইউপেনশন’ নামক ওয়েবসাইট উদ্বোধন করা হয়েছে। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যে কেউ পেনশন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেককে একটি ইউনিক আইডি নম্বর দেওয়া হবে। পত্রিকান্তরে জানা গেছে, সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে দেশের ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী নাগরিক এ ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারেন। ৬০ বছর বয়স থেকে তারা আজীবন পেনশনও পাবেন। শুরুর দিকে চিন্তা না থাকলেও পরে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদেরও পেনশন কর্মসূচির আওতায় রাখার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তারা টানা ১০ বছর চাঁদা দেওয়ার পর পেনশন সুবিধা পাবেন।

অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড বা তপশিলি ব্যাংকে এই স্কিমের চাঁদা জমা দেওয়া যাবে। জরিমানা ছাড়া পরবর্তী এক মাসের মধ্যে চাঁদা দেওয়া যাবে। তবে এর বেশি সময় অতিবাহিত হলে প্রতিদিনের জন্য গুনতে হবে ১ শতাংশ হারে বিলম্ব ফি। পরপর তিন মাস চাঁদা দিতে ব্যর্থ হলে পেনশন হিসাব স্থগিত হয়ে যাবে। সব বকেয়া পরিশোধ না হলে তা আর সচল হবে না।

চাঁদাদাতা নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনে চিকিৎসা, গৃহনির্মাণ, গৃহ মেরামত এবং সন্তানদের বিয়ের জন্য তহবিলে জমাকৃত অর্থের ৫০ শতাংশ ঋণ হিসেবে তুলতে পারবেন। তা নির্ধারিত ফিসহ সর্বোচ্চ ২৪ কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে, যা তার হিসাবে জমা হবে। একটি ঋণ চলমান থাকতে নতুন করে ঋণ নেওয়া যাবে না। মার্সার সিএফএ ইনস্টিটিউট গ্লোবাল পেনশন ইনডেক্সে (এমসিজিপিআই) বিশ্বের ৪৪টি দেশের অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। এ তালিকায় প্রথম দিকে আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, ইসরায়েল, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, সুইডেন, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যের নাম রয়েছে।

তালিকায় বাংলাদেশের নাম ছিল না। তবে গত বৃহস্পতিবার উদ্বোধনের পর সর্বজনীন পেনশনের তালিকায় প্রবেশ করল বাংলাদেশ।

আগেই বলেছি, সঞ্চয়মুখী ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ার অভিপ্রায়ে প্রথমবারের মতো সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির প্রচলন অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া মানুষ পেনশন তুলতে গিয়ে যে ভোগান্তির শিকার হন, তা আমলে নিলে আলোচ্য কর্মসূচিতে সবার অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। যে কারণে কর্মসূচির পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের বিকল্প নেই। সাধারণ জনগণের সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে পেনশন উত্তোলনের ব্যবস্থা যদি করা যায়, তাহলে এ কর্মসূচি জনপ্রিয়তা পাবে বলে মনে করি। সেই সঙ্গে তহবিল ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং বিনিয়োগ থেকে তুলনামূলক আকর্ষণীয় আয়ের ব্যাপারটিও নজরে নিতে হবে। অনেক আগে থেকে আলোচনায় থাকলেও বস্তুত এমন সময়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত এলো, যখন দেশের ব্যাংক খাতে সংকট চলছে। এ ছাড়া রিজার্ভ সংকটসহ বিনিয়োগে স্থবিরতার বিষয়টিও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পেনশন কর্মসূচির সফলতা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে, তাতে সন্দেহ নেই। তারপরও জনবান্ধব এ কর্মসূচি সার্থক করার জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। সেই সঙ্গে এই কাজে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও গভীরভাবে সংযুক্ত করতে হবে।

এ কর্মসূচি সার্থক হলে দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে। এ জন্য অবশ্য সামগ্রিক কর্মসূচির সফল উদাহরণ তৈরি করা প্রয়োজন। অন্যদিকে প্রক্রিয়াটি যেহেতু অনলাইনে বা ভার্চুয়ালি করা হচ্ছে, এ জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা প্ল্যাটফর্মের প্রযুক্তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করায়ও প্রাধান্য থাকতে হবে।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

ঢাকানিউজ২৪.কম /

আরো পড়ুন

banner image
banner image