• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ১৬ আগষ্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

যেভাবে বাস্তবে রূপ নিল পদ্মা সেতু


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১২:৫১ পিএম
পদ্মা সেতু নির্মাণ কার্যক্রমে তারা কোনো অবদান রাখতে পারে
পদ্মা সেতু

সৈয়দ আবুল হোসেন

বঙ্গবন্ধু সেতু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীসহ পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভূত অবদান রাখে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণ অবাধ সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য দীর্ঘকাল থেকে দাবি জানিয়ে আসছিল। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে সরকার গঠন করে এবং ১৯৯৮ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ১৯৯৯ সালে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়। ২০০১ সালের ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাওয়া পয়েন্টে (বর্তমান সেতুর অবস্থানে) পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ইআরডি ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। এক পর্যায়ে জাপান সরকার ইআরডির প্রস্তাবে সম্মত হয় এবং ২০০১ সালের ১৮ জুন নোট-ভারবালে স্বাক্ষর করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালের ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সমীক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

‘বিএনপি’র পাঁচ বছর: পদ্মা সেতুর ‘নো প্রগ্রেস’

২০০১ সালের শেষের দিকে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসে তারা সেতুর কার্যক্রম এগিয়ে না নিয়ে পূর্বনির্ধারিত স্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করে। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাওয়া পয়েন্টে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন, তাই এ জায়গায় পদ্মা সেতু না করার জন্য বিএনপি সমীক্ষার নামে পাঁচ বছর কালক্ষেপণ করে। ‘বিএনপি’র নির্দেশনায় পরামর্শক কমিটি ১. পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পয়েন্ট, ২. দোহার-চরভদ্রাসন পয়েন্ট, ৩. মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট এবং ৪. চাঁদপুর-ভেদরগঞ্জ পয়েন্টে প্রি-ফিজিবিলিটি করায়। সমীক্ষায় বলা হয়, ‘আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে পদ্মা সেতু নির্মাণ কারিগরি ও আর্থিকভাবে অধিক লাভজনক।’ ২০০৪ সালে জাইকা নিয়োজিত কনসালট্যান্ট নিপ্পন কোয়েই পদ্মা সেতু নির্মাণকল্পে বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনার পর আগে নির্ধারিত মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টেই সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেয়। বিএনপি ফিজিবিলিটি স্টাডির নামে পাঁচ বছর সময়ক্ষেপণ করল। সেতু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার কিছু করতে পারেনি। পদ্মা সেতু নির্মাণ কার্যক্রমে তারা কোনো অবদান রাখতে পারেনি, তাদের সে যোগ্যতাও ছিল না।

পদ্মা সেতু: আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯

আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করে। আমিও মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করি। শপথ গ্রহণের আগে মন্ত্রীদের দায়িত্ব বণ্টন হয়নি। হলেও কারো জানা ছিল না কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন বা পাবেন। শপথের পর আপ্যায়নের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে কাছে ডেকে বললেন, ‘তোমাকে সরকারের এ মেয়াদের মধ্যেই পদ্মা সেতু চালু করতে হবে। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জনগণের প্রতি আমার নির্বাচনী অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে এ মেয়াদে পদ্মা সেতু চালু করে আমি এর সফলতা দিয়ে পরবর্তী মেয়াদে নির্বাচিত হতে চাই। আন্তরিকভাবে কাজে লেগে যাও।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথায় বুঝলাম আমি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে চলেছি। অবশ্য বঙ্গভবন ত্যাগের আগেই আমি মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টনের প্রজ্ঞাপন পেয়ে যাই।

পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন কাজ শুরু

যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দিন থেকে আমি পদ্মা সেতু নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করি। ২০০৯ সালের ৯ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের চারদিনের মাথায় অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় পদ্মা বহুমুখী সেতুর ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। একই মাসের ২৯ জানুয়ারি সেতুর ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিস্তারিত ডিজাইন প্রণয়নের কাজ শুরু করে। চুক্তি অনুযায়ী ২২ মাসের মধ্যে বিস্তারিত ডিজাইন প্রণয়ন, প্রি-কোয়ালিফিকেশন ডকুমেন্ট ও মূল টেন্ডার ডকুমেন্ট প্রণয়ন এবং টেন্ডার প্রস্তাবের কারিগরি মূল্যায়নে সেতু বিভাগকে সহায়তা ইত্যাদি শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু ১৮ মাসের মধ্যে উল্লিখিত কাজ শেষ করার লক্ষ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেতু বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে একটি অ্যাকসিলারেটেড প্রোগ্রাম গ্রহণ করে। প্রকল্পের যাবতীয় কাজ বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত দক্ষতা, দ্রুততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করতে থাকে। এরই মধ্যে একজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়। সেতু বিভাগের প্রকৌশলীর সঙ্গে কাজ করার জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক বিভাগ থেকে অভিজ্ঞ কিছু প্রকৌশলী এবং যোগ্য কর্মকর্তা প্রেষণে আনা হয়। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প দেশের সর্ববৃহৎ সেতু প্রকল্প। এসব বিবেচনায় যোগ্য ব্যক্তিদের পদ্মা সেতু নির্মাণ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩টি বিদেশী প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব দাখিল করে।

প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন

সময়ক্ষেপণ পরিহার করে একই সঙ্গে প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ এগিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হয়। একদিকে ডিজাইন প্রণয়ন এবং অন্যদিকে আনুষঙ্গিক কাজের প্রস্তুতি তথা জমি অধিগ্রহণ, মূল্য প্রদান, পুনর্বাসন সাইট উন্নয়ন, পরিকল্পনামতে রাস্তাঘাট ও ইউটিলিটি সার্ভিস স্থাপন, নাগরিক সুবিধাদির ব্যবস্থাকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রম স্বচ্ছতার সঙ্গে দ্রুত সম্পাদনের পদক্ষেপ নেয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট ১ হাজার ১২৫ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়। প্রচলিত বিধিমতে, জমি অধিগ্রহণের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ওপর। তিনটি জেলায় ভূমি অধিগ্রহণের ফলে ১৫ হাজার ২৬১ পরিবারের প্রায় ৭৯ হাজার ৪৭১ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায়, তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য নদীর উভয় পাড়ে দুটি করে মোট চারটি পুনর্বাসন সাইট নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। এসব কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পাদন করা হয়। জমি অধিগ্রহণের অর্থ পরিশোধের বিষয়ে কিছু অভিযোগ পাওয়া গেলেও তাত্ক্ষণিক জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া হয়। সেতুর স্থানসংলগ্ন মাওয়া ও জাজিরা পাড়ের অধিগ্রহণ করা কিছু জমির মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মূল্য পুনর্নির্ধারণ ও প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের গৃহীত পদক্ষেপ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও এলাকার জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়।

প্রকল্প এলাকায় চলমান কাজ পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের জন্য আমি নিয়মিত সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শনে যেতাম। প্রায় প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনগুলোয় পদ্মাপাড়ে যেতাম। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও আইডিবির বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ, প্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। তারা কাজের মান ও অগ্রগতি অবলোকন করে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

পদ্মা সেতুর পাঁচটি প্যাকেজ

পদ্মা সেতু প্রকল্পের ভৌত কাজকে মূলত পাঁচটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়। যথা ১. মূল সেতু, ২. নদী শাসন, ৩. জাজিরা অ্যাপ্রোচ রোড ও টোল প্লাজা, ৪. মাওয়া অ্যাপ্রোচ রোড ও টোল প্লাজা এবং ৫. জাজিরা সার্ভিস এরিয়া। এসব কাজ বাস্তবায়নে বিদ্যমান নীতি অনুসরণ করা হয়। প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসব কাজে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রি-কোয়ালিফিকেশন বিড ডকুমেন্ট প্রণয়ন করে সেতু বিভাগে জমা দেয়। সেতু বিভাগে নিয়োজিত প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞ কমিটি বিড ডকুমেন্ট যাচাই-বাছাই করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সম্মতির জন্য পাঠানো হয়। বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে উন্নয়ন সহযোগী টাস্ক টিম বিভিন্ন সময় এসব ডকুমেন্ট প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ সম্মতি দেয়। অতঃপর আহ্বান করা হয় প্রি-কোয়ালিফিকেশন টেন্ডার।

মূল সেতু নির্মাণ: প্রি-কোয়ালিফিকেশন টেন্ডার আহ্বান

মূল সেতুর নির্মাণকাজের প্রি-কোয়ালিফিকেশন টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল আহ্বান করা হয়। বিভিন্ন সংবাদপত্রে ১১ এপ্রিল এ বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়। সারা বিশ্বের ৪০টি প্রতিষ্ঠান প্রি-কোয়ালিফিকেশন ডকুমেন্ট ক্রয় করে। প্রস্তাব জমা দেয়ার নির্ধারিত তারিখ জুন, ২০১০-এর মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠান তাদের টেন্ডার প্রস্তাব জমা দেয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগের জন্য গঠিত কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি ‘টিইসি’র চূড়ান্ত মূল্যায়নে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্রাক-যোগ্য বিবেচিত হয়।

মূল সেতুর নির্মাণকাজের প্রি-কোয়ালিফিকেশন টেন্ডার আহ্বানের আগেই প্রকল্পের নির্মাণ তদারকি পরামর্শক ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) নিয়োগের আহ্বান করা হয়। নির্মাণ তদারকি প্রতিষ্ঠান সিএসসি (সিএসসি) নির্বাচনের জন্য ১৩টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। তাদের মধ্য থেকে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখা হয়। ২০১০ সালের ২৯ মার্চ লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) আহ্বান করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব দাখিল করে। 

মূল সেতুর প্রি-কোয়ালিফিকেশন: টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংক টিমের কোয়ারি

বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির মূল্যায়নের পর পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের তালিকা ২০১০ সালের ২০ জুলাই টাস্ক টিমের সম্মতির জন্য বিশ্বব্যাংকে পাঠানো হয়। বিশ্বব্যাংকের গাইডলাইন অনুসরণ করে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। তবুও বিশ্বব্যাংক পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে প্রায় দুই মাস মূল্যায়নটি ধরে রাখে। বিশ্বব্যাংক টিম ২০১০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পুনরায় প্রি-কোয়ালিফিকেশন টেন্ডার আহ্বানের পরামর্শ দেয়। যেসব যুক্তিতে পুনঃটেন্ডার আহ্বান করার জন্য বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দেয় সেগুলো যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য ছিল না। কাজের দ্রুততার জন্য বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মেনে নিয়ে প্রি-কোয়ালিফিকেশন শর্ত আংশিক পরিবর্তন করে ১০ অক্টোবর পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এবার ৪২টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র ক্রয় করে। দরপ্রস্তাব দাখিলের শেষ দিন, অর্থাৎ ২৪ নভেম্বর ১০টি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব দাখিল করে। এদের মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের দরপত্র প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিল।

সুপারভিশন কনসালট্যান্ট নিয়োগ: টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া

মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা দরকার। মূল সেতু, নদী শাসন, সংযোগ সড়কসহ যাবতীয় নির্মাণ প্যাকেজের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিকে সহায়তা করে সেতু কর্তৃপক্ষ নিয়োজিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের ডিজাইন পরামর্শক মনসেল-এইকম। প্রথমে মনসেল-এইকমের ঢাকাস্থ প্রকল্প অফিসে নিয়োজিত কারিগরি বিশেষজ্ঞরা দরপ্রস্তাবগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেন। এরপর ই-মেইলের মাধ্যমে এদের নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও হংকং অফিসে দায়িত্বরত উচ্চপদস্থ বিশেষজ্ঞদের সম্মতি গ্রহণের পর কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির (টিইসি) কাছে প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করা হয়। পদ্মা সেতু প্রকল্পের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করে। কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ছিলেন সততা, ব্যক্তিত্ব, সুনাম ও পেশাদারি দক্ষতায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। প্রথমবার টেন্ডার আহ্বানের পর যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্রাক-যোগ্য বিবেচিত হয়েছিল, বিশ্বব্যাংকের অনুরোধে দ্বিতীয়বার টেন্ডার আহ্বানের পর প্রাপ্ত টেন্ডার প্রস্তাবগুলো মূল্যায়নেও আগের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই প্রাক-যোগ্য বিবেচিত হয়।

দরদাতা প্রি-কোয়ালিফিকেশন: মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের তদবির

দ্বিতীয়বারের প্রি-কোয়ালিফিকেশন মূল্যায়ন প্রতিবেদন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি বিশ্বব্যাংকে পাঠায়। ২০১১ সালের ২৯ মার্চ  বিশ্বব্যাংক টাস্ক টিম লিডার একটি ই-মেইলের মাধ্যমে টিইসির মূল্যায়নে বাদ পড়া চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিআরসিসি) নামের প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনার জন্য বিষয়টি পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অনুরোধ করে। সেই মতে ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সিআরসিসির দাখিলীয় কাগজপত্র পুনঃপরীক্ষা করে এবং সিআরসিকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করা যায় না মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করে। সেতু কর্তৃপক্ষ ৩০ মার্চ এ প্রতিবেদন বিশ্বব্যাংকে পাঠায়। প্রত্যুত্তরে বিশ্বব্যাংক পুনরায় সিআরসিসিকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনার অনুরোধ করলে সেতু বিভাগ এ প্রতিষ্ঠানকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনা না করার কারণ ব্যাখ্যা করে বিশ্বব্যাংকে পত্র দেয়।

২০১১ সালের ১৩ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক সিআরসিসির কাছ থেকে বৃহৎ সেতু নির্মাণের বিষয়ে অধিকতর তথ্য সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক ওই প্রতিষ্ঠানকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করার জন্য পুনরায় প্রস্তাব পাঠায়। বিশ্বব্যাংকের বারবার অনুরোধের কারণে সেতু কর্তৃপক্ষ সিআরসিসির কাছে পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ সেতুর কাজে তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার সপক্ষে ড্রইং, ডিজাইন, নির্মাণসামগ্রী ও রেকিং পাইলে ব্যবহূত হ্যামারের বর্ণনা এবং সেতু ও পাইলিংয়ের ছবি পাঠানোর জন্য চিঠি লেখে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সিআরসিসি যেসব তথ্য ও ছবি পাঠায়, তাতে ডিজাইন পরামর্শক ও মূল্যায়ন কমিটি বড় রকমের অসংগতি দেখতে পায়। সিআরসিসি অন্য প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ করা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ব্রিজের ছবি পরিবর্তন করে নিজেদের নির্মিত দাবি করে জমা দিয়েছিল। তাছাড়া পাইলিং ইকুইপমেন্ট ও অন্যান্য কারিগরি বিষয়ে যেসব তথ্যাদি দাখিল করে, তাতে প্রমাণিত হয় যে পদ্মা সেতুর মতো বড় সেতুর র্যাকিং পাইলিং করার যোগ্যতা তাদের নেই।

ভেনচার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে বাংলাদেশী একটি প্রতিষ্ঠান সিআরসিসির স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। জানা যায়, ক্যাপ্টেন রেজা নামের একজন ঠিকাদার এর স্বত্বাধিকারী। চিঠিপত্রে দীপ্তিময় তঞ্চঙ্গ্যা নামের একজন পরিচালক স্বাক্ষর করেন। এ প্রতিষ্ঠানের চিঠিপত্র, সিআরসিসির ব্যবহূত লেটার প্যাড ইত্যাদি দেখে আমার সন্দেহ হয়। ৮ মে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের ইকোনমিক কাউন্সিলরকে সেতু বিভাগে আমার অফিসে আমন্ত্রণ জানাই। কাউন্সিলরকে সিআরসিসির বিভিন্ন চিঠি দেখানো হয়। তিনি জানান, চিঠিতে প্রদত্ত চীনা কর্মকর্তার স্বাক্ষর চীনা ভাষার নকল। লেটার হেডটিও হংকং অফিসের ঠিকানায় ছাপা এবং এটি বেইজিংয়ের সিআরসিসির মূল অফিসের নয়। দূতাবাসের ইকোনমিক কাউন্সিলর তত্ক্ষণাৎ বেইজিংয়ে সিআরসিসির সদর দপ্তরে কথা বলেন। টেলিফোনের কথায় মনে হলো, কাগজপত্র জাল করার জন্য তিনি সিআরসিসি কর্তৃপক্ষকে ভবিষ্যতে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার আশঙ্কার বিষয়ে সতর্ক করছেন। [চলবে]

সৈয়দ আবুল হোসেন: সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী

ঢাকানিউজ২৪.কম /

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image