• ঢাকা
  • বুধবার, ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ০৫ অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবেও ইউরোপকে সচল করতে হবে


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ আগষ্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০১:৪৩ পিএম
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি বর্ধমান শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান
ukrine & rassia meeting

স্লাভো জিজেক

কানাডিয়ান মনোবিজ্ঞানী ও বিকল্প ডানপন্থার অন্যতম বিশ্লেষক জর্ডান পিটারসন সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ এক অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে হাজির হয়েছেন। ‘রাশিয়া বনাম ইউক্রেন’ অথবা ‘পশ্চিমে গৃহযুদ্ধ’ শীর্ষক একটি পডকাস্ট পর্বে তিনি ইউরোপের যুদ্ধ এবং উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপীয় উদার মূলধারা বনাম নব্য ডানপন্থী দ্বন্দ্বের মধ্যে একটি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। পিটারসন যদিও প্রথমে নিন্দা জানিয়েছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, কিন্তু তার অবস্থান ধীরে ধীরে রাশিয়ার পক্ষে এক রকমের আধিভৌতিক প্রতিরক্ষায় রূপ নিয়েছে। দস্তয়েভস্কির আ রাইটার’স ডায়েরির উদাহরণ টেনে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, পশ্চিম ইউরোপে আনন্দভোগের ব্যক্তিকেন্দ্রিক দর্শন রাশিয়ার যৌথ আধ্যাত্মিকতার চেয়ে অনেক নিকৃষ্ট। তিনি উত্তরাধুনিকতাকে মার্ক্সবাদের একটি রূপান্তর হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটা মূলত খ্রিস্টান সভ্যতার ভিত্তিগুলোকে ধ্বংস করতে আগ্রহী। এ আলোকে বলা যায়, ইউক্রেন যুদ্ধ মূলত ঐতিহ্যবাহী খ্রিস্টান মূল্যবোধ ও অধঃপতিত কমিউনিস্ট দর্শনের নতুন একটি রূপের মধ্যকার প্রতিযোগিতার ফসল।

হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের শাসনামলে কিংবা ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ইউএস ক্যাপিটালে বিদ্রোহের সময় অনেকেই এর সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। সিএনএনের জন ব্লেক যেমন বলেছেন, সেদিন প্রথমবার অনেক আমেরিকান বুঝতে পেরেছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি বর্ধমান শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মুখোমুখি, যা একটি শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান আমেরিকা গঠনের লক্ষ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্য ও শত্রুতা আড়াল করতে খ্রিস্টান ভাষা ব্যবহার করে। বৈশ্বিক এ দৃষ্টিভঙ্গি এখন ধর্মীয় মূলধারায় এতটাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুপ্রবেশ করেছে যে কার্যত রক্ষণশীল খ্রিস্টান যাজকদের মধ্যে যারা এ মতাদর্শকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করবেন তারা মূলত তাদের ক্যারিয়ারকেই ঝুঁকিতে ফেলবেন।

পিটারসনের রুশপন্থী, কমিউনিস্টবিরোধী অবস্থান গ্রহণ একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতারই ইঙ্গিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেমন রিপাবলিকান পার্টির অনেক আইনপ্রণেতা ইউক্রেনকে সমর্থন দিতে অসম্মতি জানিয়েছেন। ওহাইও অঙ্গরাজ্য থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থিত রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘আমাদের নিজের দেশের সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করে ইউক্রেনে বিলিয়ন বিলিয়ন সম্পদ উৎসর্গ করা অপমানজনক এবং কৌশলগত বোকামি।’ আগামী নভেম্বরে যদি তার দল চেম্বারের নিয়ন্ত্রণ জিতে নেয় সেক্ষেত্রে ফ্লোরিডার প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান সদস্য ম্যাট গেটজ ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সমর্থন বন্ধ করতে তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু পিটারসনের ধারণাকে মেনে নেয়ার অর্থ কি এটা, রাশিয়ার যুদ্ধ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিকল্প ডানপন্থার উত্থান একই বৈশ্বিক আন্দোলনের প্লাটুন? বামপন্থীদের যেখানে বিপরীত অবস্থান নেয়া উচিত। এ পর্যায়ে পরিস্থিতি আরো জটিল। পিটারসন কমিউনিজমের বিরোধিতা করলেও পুঁজিবাদের বিশ্বব্যাপী প্রবণতারও সমালোচনা করেছেন।

১৫০ বছর আগে মার্ক্স ও অ্যাঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে লিখেছিলেন, ‘বুর্জোয়া শ্রেণী যেখানেই প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানেই সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক, পিতৃতান্ত্রিক ও প্রকৃতি-শোভন সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। যেসব বিচিত্র সামন্ত-বাঁধনে মানুষ বাঁধা ছিল তার স্বভাবসিদ্ধ ঊর্ধ্বতনদের কাছে, তা এরা ছিঁড়ে ফেলেছে নির্মমভাবে, মানুষের সঙ্গে মানুষের নগ্ন স্বার্থের বন্ধন, নির্বিকার ‘নগদ দেনাপাওনার’ সম্পর্ক ছাড়া আর কিছুই এরা অবশিষ্ট রাখেনি। আত্মসর্বস্ব হিসাব-নিকাশের ঠাণ্ডা জলে এরা ডুবিয়ে দিয়েছে ধর্ম-উন্মাদনার স্বর্গীয় ভাবোচ্ছ্বাস, শৌর্যবৃত্তির উৎসাহ ও কূপমণ্ডূক ভাবালুতা। লোকের ব্যক্তিমূল্যকে এরা পরিণত করেছে বিনিময়মূল্যে, অগণিত অনস্বীকার্য সনদবদ্ধ স্বাধীনতার স্থলে এরা এনে খাড়া করেছে ওই একটি মাত্র নির্বিচার স্বাধীনতা—অবাধ বাণিজ্য।’

এ পর্যবেক্ষণ বামপন্থী ধারার অনেক তাত্ত্বিক আবার উপেক্ষা করেন, বিশেষ করে যাদের সমালোচনাগুলো এখনো পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ ও অনুশীলনের ওপর নির্ভরশীল। যদিও নাটকীয়ভাবেই কিন্তু পিতৃতন্ত্রের সমালোচনার অবসান ঘটেছে। একটি সময়ে পিতৃতন্ত্র এর আধিপত্য হারায়, যখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ একে রীতিমতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সর্বোপরি, যখন একটি শিশু তার পিতা-মাতার অবহেলা কিংবা দুর্ব্যবহারের জন্য মামলা করতে পারে তখন পুরুষতান্ত্রিক পারিবারিক মূল্যবোধের পরিণতি কী হয়! (উল্লেখ্য, পিতৃত্ব কেবল উপযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আরেকটি অস্থায়ী চুক্তি মাত্র)।

এখানে মনে রাখতে হবে, বামপন্থী নেকড়েদের পালের মধ্যে ছদ্মবেশী এ ধরনের কিছু ভেড়াও রয়েছে, যারা নিজেদের র্যাডিক্যাল বিপ্লবী হিসেবে দাবি করে। অথচ তলে তলে তারা শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থগুলোকেই সুরক্ষা দেয়। মার্ক্স যতটা কল্পনা করতে সমর্থ হয়েছিলেন, আজকের প্রাক-আধুনিক সামাজিক সম্পর্কের চেহারা তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ হয়েছে। মানুষ পরিচয়টা বহন করাটা আজ শুধুই একটা পছন্দের ব্যাপার মাত্র। মানুষ হিসেবে নীতি-নৈতিকতা-মূল্যবোধের খুব একটা পরোয়া করতে হচ্ছে না। আর মানুষের প্রবণতাগুলো এখন স্রেফ প্রযুক্তিগত কারসাজির বস্তু হয়ে উঠেছে।

পিটারসন উন্নত পশ্চিমের যে গৃহযুদ্ধ দেখছেন তা মূলত সিংহের মাথা, ছাগলের দেহ ও সাপের লেজবিশিষ্ট কাল্পনিক দানব কাইমেরা—একটি দেহে ভিন্ন অস্তিত্ব অর্থাৎ একই বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দুটি সংস্করণের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। অনিয়ন্ত্রিত উদারনৈতিক ব্যক্তিবাদ বনাম নব্য ফ্যাসিবাদী রক্ষণশীলতাবাদ, যা ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ও শ্রেণীবিন্যাসের সঙ্গে পুঁজিবাদী গতিশীলতাকে একত্র করতে চায়।

এখানে একটি প্যারাডক্স রয়েছে। পশ্চিমা রাজনৈতিক সংস্কার (জাগরণ) মূলত শ্রেণী-সংগ্রামকে স্থানচ্যুত করেছে এবং একটি উদার অভিজাত শ্রেণী তৈরি করেছে, যারা তার জনগণকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য জাতিগত হুমকির ভয় দেখিয়ে মেরুকরণ করছে। এ ধরনের মিথ্যাচার উসকে দিচ্ছে বিকল্প ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদকে। জনতুষ্টিবাদী নেতারা আবার ‘সত্যিকারের’ মানুষের রক্ষাকারী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। তারা করপোরেট ও ক্ষমতাবাদ এলিটদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। অথচ তারা নিজেরাই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অনন্য উচ্চতায় বসে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দিচ্ছেন।

শেষ পর্যন্ত দুটি পক্ষই একে অন্যকে দায়ী করছে এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। অথচ গোটা ব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য তারা উভয়ই সমভাবে জড়িত। এ দুটি দলের কেউই প্রকৃতপক্ষে শোষিতদের পক্ষে দাঁড়ায় না বা শ্রমিক-শ্রেণীর সংহতির প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তবে এর মানে এই নয় যে ‘বাম’ ও ‘ডান’ পন্থা সেকেলে ধারণা, যেমটা আমরা প্রায়ই শুনি। এ ধরনের সাংস্কৃতিক যুদ্ধগুলো বরং শ্রেণী-সংগ্রামের মতো রাজনৈতিক চালিকাশক্তিকে স্থানচ্যুত করেছে।

‘ইউরোপ ছেড়ে তারা কোথায় যাবে?’ গার্ডিয়ানের লেখক সাইমন টিসডাল তার নিবন্ধে বিবর্ণ কিন্তু সত্যিকারের চিত্রটিই তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। ‘পুতিনের লক্ষ্য হলো ইউরোপকে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করা। জ্বালানি, খাদ্য, শরণার্থী ও তথ্যপ্রযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগিয়ে রাশিয়ার নেতারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যন্ত্রণা ছড়িয়ে দিয়ে সবার জন্য একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করছেন। বিদ্যুতের ঘাটতি নিয়ে শুরু হওয়া একটি দীর্ঘ, শীতল, বিপর্যস্ত ইউরোপীয় শীতকাল মূলত অশান্তির অনুভূতি তৈরি করে। বয়স্করা ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছে, চারদিকে ক্ষুধার্ত শিশু, সুপারমার্কেটের তাকগুলো শূন্য, জীবনযাত্রার অসাধ্য খরচ, অবমূল্যায়িত শ্রম, একের পর এক ধর্মঘট, রাস্তায় রাস্তায় জনবিক্ষোভ শ্রীলংকার মতো বিপর্যয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে। এগুলো অতিরঞ্জন? মোটেই কিন্তু তা নয়।’

বিশৃঙ্খলা থেকে উৎসারিত পতন রোধে রাষ্ট্রযন্ত্রকে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে এবং জনগণের স্থানীয় সংহতির ওপর নির্ভর করে শক্তি ও খাদ্যের বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এখানে সশস্ত্র বাহিনীর দ্বারা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণেরও প্রয়োজন হতে পারে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য নিয়ে চরম উদ্বেগের এ মুহূর্তে ইউরোপের কাছে তার বিচ্ছিন্ন কল্যাণকর মোহনীয় জীবনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য সুযোগ এসেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি ভোগ ম্যাগাজিনের কাছে যেমন বলেছেন, ‘আপনি দয়া করে কল্পনা করুন, আমি যে ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বলছি তা আপনার দেশে আপনার পরিবারের সঙ্গে ঘটছে। তাহলে আপনি কি এখনো গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নিয়েই চিন্তা করতেন?’

জেলেনস্কি ঠিক বলছেন। ইউরোপ আক্রান্ত হয়েছে। একে শুধু সামরিকভাবে নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবেও সচল করতে হবে। সংকটজনক এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের জীবনযাপনের ধারায় পরিবর্তন আনা জরুরি। আমাদের এমন মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে, যা আগামী দশকগুলোয় পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে আমাদের রক্ষা করবে। আর এটাই সম্ভবত আমাদের একমাত্র সুযোগ।

(স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট )

স্লাভো জিজেক: ইউরোপিয়ান গ্র্যাজুয়েট স্কুলের দর্শনের অধ্যাপক, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কবেক ইনস্টিটিউট ফর দ্য হিউম্যানিটিজের আন্তর্জাতিক পরিচালক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

ঢাকানিউজ২৪.কম /

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image