• ঢাকা
  • রবিবার, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ; ০৩ ডিসেম্বর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image
website logo

মৃতপ্রায় খরস্রোতা আত্রাই নদী


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ১১:০৫ এএম
মৃতপ্রায় খরস্রোতা
আত্রাই নদী

অলোক আচার্য   

এক সময়ের খরস্রোতা আত্রাই নদী পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর হাটের কাছে এসেই পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে। নদীর এই অংশ দখল করে গড়ে উঠেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শতাধিক অবৈধ স্থাপনা। এমনকি এসব স্থাপনায় নির্বিঘ্নে যাতায়াত ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য নদের এপাড়-ওপাড় গড়ে তোলা হয়েছে চওড়া পাকা রাস্তা। সেই রাস্তারও দুই পাশে গড়ে উঠেছে প্রচুর দোকানপাট। এতে এই স্থানে প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে নদীটির অস্তিত্বই একেবারেই বিলিন হয়ে গেয়ে। 

আত্রাই নদীর উৎপত্তি সাঁথিয়া উপজেলার নন্দনপুর ইউনিয়নে ইছামতী নদী থেকে। এর পর এটি সাঁথিয়া, বেড়া ও সুজানগর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বেড়া উপজেলার মাসুন্দিয়া ইউনিয়নে বাদাই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মায় গিয়ে মিশেছে। উপজেলার কাশিনাথপুর বাজারের কাছে নদীটিকে পুরোপুরি ভরাট করায় এর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ আর নেই। তবে নদীর উৎসস্থল থেকে মোহনা পর্যন্ত বাকি অংশ স্রোতহীন ও বদ্ধ জলাশয় অবস্থায় কোনোরকমে টিকে আছে। অথচ এলাকাবাসীর ভাষ্য, নব্বইর দশকে এই নদী দিয়ে চলাচল বড় বড় নৌকা হত নৌকা বাইজ। এই নদীতে পাওয়া যেত ইলিশসহ নানা রকম সুস্বাদু মাছ। 
সরেজমিনে ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, কাশিনাথপুরের অবস্থান পাবনার সাঁথিয়া, বেড়া ও সুজানগর উপজেলার সংযোগস্থলে। পাবনা-ঢাকা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় ওই স্থানটি পাবনা জেলার অন্যতম ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হয়ে উঠেছে। তবে দখলের স্থানসহ ব্যবসাকেন্দ্রের বেশির ভাগ অংশ পড়েছে সাঁথিয়া উপজেলার মধ্যে। জেলার অন্যতম ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার কারণে কাশীনাথপুর হাটের পার্শ্ববর্তী এলাকার জায়গার দাম আকাশচুম্বি হয়ে পড়েছে। এতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা লোভ সংবরণ করতে না পেরে নদীর জায়গা ইচ্ছেমত দখল করার মহোৎসবে মেতে উঠেছেন।

কাশিনাথপুর ট্রাফিক মোড় থেকে হাটের শেষ সীমানা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার দখলে নিয়ে নদীর দুই পাড় আবার কোথাও কোথাও পুরো অংশ জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবনসহ শতাধিক পাকা ও আধাপাকা স্থাপনা। বেশির ভাগ স্থাপনাতে রয়েছে দোকান, ক্লিনিকসহ বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। শতাধিক স্থাপনা হলেও দখলকারী ২৫-৩০ জন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

দখল হওয়া অংশের মধ্যে কাশিনাথপুর হাটসংলগ্ন অংশে নদীর কোনো অস্তিত্ব নেই। এই অংশে নদের মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে একটি ছোট সেতু। এর দুদিকে নদীর এপাড়-ওপাড় পর্যন্ত পাকা সড়ক। প্রশাসনের নজরদারির অভাব ও আইনের প্রয়োগ না থাকায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা নির্মাণ করেছেন অসংখ্য বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন। এই স্থানে এসে কারোরই বোঝার উপায় নেই যে, একসময় এখানে একটি খরস্রোতা নদী ছিল। কী পরিমাণ জায়গা দখল হয়েছে, সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য নেই স্থানীয় প্রশাসনের কাছে।

স্থানীয়রা আরও জানান, দখলের মহোৎসব শুরু হয় ২০০৩ সালের দিকে। ওই সময় সুজানগর উপজেলার আহম্মদপুর ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রয়াত জালালউদ্দিন মিয়ার উদ্যোগে সরকারি অর্থে আত্রাই নদীর ওপর সেতু ও পাকা রাস্তা নির্মিত হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ রাস্তা নির্মাণের পর পরই তিনি রাস্তার দুই পাশে সাত-আটটি দোকান গড়ে তোলেন। আর তার পর থেকেই দখলের হিড়িক পড়ে যায়। 

এ ব্যাপারে প্রয়াত জালালউদ্দিনের ছেলে ও সেখানকার ব্যবসায়ী মো. আলামিন মিয়া জানান, নদীর পাড়ে থাকা তাঁদের নিজস্ব জমিতেই তাঁরা দোকানপাট গড়েছেন। তবে কাশিনাথপুর মৌজা অংশে সামান্য কিছু সরকারি জায়গা তাঁদের দখলে থাকতে পারে। সরকারি নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তাঁরা সে অংশ ছেড়ে দেবেন। আর প্রায় ২০ বছর আগে তাঁর বাবা ইউপি চেয়ারম্যান থাকাকালে নদীতে সেতু ও রাস্তা হয়েছিল। তখন তিনি ছোট ছিলেন। তাঁর জানা মতে সরকারিভাবে ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে এই রাস্তা ও সেতু নির্মাণ হয়েছে।

নদীর ওপর নির্মাণ করা সড়কের দুপাশে যে দোকানগুলো গড়ে উঠেছে সেগুলোর চার-পাঁচটির ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দোকান ভাড়া নিয়ে তাঁরা ব্যবসা করছেন। নদী দখল করে এগুলো গড়ে তোলা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে তাঁরা জানেন না। 

স্থানীয় পাঠাগার ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তাবেড়া মাশুমদিয়া কে.জে.বি ডিগ্রি কলেজের সহকারী প্রভাষক মো.আলাউল হোসেন বলেন,‘দখলের কারণে স্রোতস্বিনী আত্রাই নদী কাশিনাথপুরে এসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আমরা আত্রাইকে রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে দাবি জানিয়ে এসেছি। এখন সরকারি উদ্যোগ আশা করছি।’ 

সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুদ হোসেন জানান, ‘আত্রাই নদ রক্ষার ব্যাপারে আমাদের একাধিক মিটিং হয়েছে। ইতিমধ্যেই আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের যুক্ত করে এ ব্যাপারে ছয় সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছি। কমিটি সিএস, এসএ, আরএস রেকর্ড পর্যালোচনার পাশাপাশি অতীত ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিল করলে তা নদী রক্ষা কমিশনে পাঠানো হবে। তবে নদী দখলের এই বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখিছি বলে তিনি জানান।

লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

ঢাকানিউজ২৪.কম / কেএন

আরো পড়ুন

banner image
banner image